সৌরজগতের বাইরের একটি গ্রহ থেকে প্রথমবারের মতো সরাসরি রেডিও সংকেত শনাক্ত করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। তবে এই সংকেত কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী বা এলিয়েনের উপস্থিতির ইঙ্গিত নয়। বরং এর মাধ্যমে ওই গ্রহে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি চৌম্বক ক্ষেত্রের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানের অধ্যাপক ইডো বার্জার বলেন, ‘আমি জানি রেডিও সংকেতের কথা শুনলেই ভিনগ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণী বা এলিয়েন অনুসন্ধানের বিষয়টি মাথায় আসে। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ একটি ভিন্ন ঘটনা।’
পিয়ার-রিভিউড জার্নালে প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা নতুন একটি গবেষণাপত্রে এই আবিষ্কারের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, পৃথিবী থেকে মাত্র ৬৩ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত ‘বিটা পিক্টোরিস বি’ নামের একটি বহির্গ্রহ থেকে ঘনঘন রেডিও তরঙ্গ নির্গত হতে দেখা গেছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবে এই দূরত্ব তুলনামূলকভাবে কম।
‘বিটা পিক্টোরিস বি’ বৃহস্পতি গ্রহের চেয়ে প্রায় ১২ গুণ বেশি ভরের একটি গ্যাসীয় দানব। এটি তার নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে আবর্তনরত তিনটি গ্রহের একটি। ওই নক্ষত্রটির ভর আমাদের সূর্যের তুলনায় ১ দশমিক ৭৫ গুণ বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের কেমব্রিজে অবস্থিত সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্স হার্ভার্ড অ্যান্ড স্মিথসোনিয়ানের গবেষক ইডো বার্জারের মতে, গ্রহটির চৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রক্রিয়ার কারণেই এই রেডিও তরঙ্গ উৎপন্ন হচ্ছে। নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, এর পেছনে রয়েছে পৃথিবীর মেরুপ্রভার মতো এক ধরনের অরোরা বা জ্যোতি। সূর্য বা নক্ষত্র থেকে আসা আধানযুক্ত কণার সঙ্গে চৌম্বকীয় ঝড়ের মিথস্ক্রিয়ায় এই অরোরা সৃষ্টি হয়।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর ‘আর্ক্সিভ’ প্রিপ্রিন্ট আর্কাইভে প্রকাশিত গবেষণাপত্রটির সহলেখক বার্জার আরও বলেন, ‘আমরা যে ফ্রিকোয়েন্সি পর্যন্ত এই রেডিও তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ করেছি, তা পেতে হলে গ্রহটিতে একটি অবিশ্বাস্য রকমের শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র থাকা প্রয়োজন।’
সব গ্রহের চৌম্বক ক্ষেত্র থাকে না। যেসব গ্রহের এমন ক্ষেত্র রয়েছে, তারা একটি প্রাকৃতিক ঢালের সুবিধা পায়, যা ক্ষতিকর শক্তিকে প্রতিহত করতে সহায়তা করে। পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র যেমন সৌর বায়ুর কারণে আমাদের বায়ুমণ্ডল ক্ষয় হয়ে যাওয়া থেকে সুরক্ষা দেয়। সৌর বায়ু হলো প্লাজমার একটি অবিরাম প্রবাহ, যার মধ্যে প্রোটন ও ইলেকট্রনের মতো চার্জযুক্ত কণা থাকে।
‘বিটা পিক্টোরিস বি’-এর চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তি সম্পর্কে বার্জার বলেন, ‘এই গ্রহের চৌম্বক ক্ষেত্র বৃহস্পতির চৌম্বক ক্ষেত্রের চেয়ে অন্তত ২০০ গুণ বেশি শক্তিশালী।’
নাসার তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতির চৌম্বক ক্ষেত্র এতটাই শক্তিশালী যে এটি একটি ম্যাগনেটোস্ফিয়ার বা চৌম্বক ক্ষেত্র দ্বারা প্রভাবিত মহাশূন্যের অঞ্চল তৈরি করতে পারে। এটি সৌরজগতের সবচেয়ে বড় কাঠামো হিসেবে বিবেচিত হয় এবং সূর্যের দিকে প্রায় ২০ লাখ মাইল বা ৩০ লাখ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত।
বৃহস্পতির শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র চমৎকার অরোরা বা জ্যোতি সৃষ্টি করে। এর উপগ্রহ ‘আইও’-এর আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত বৈদ্যুতিক আধানযুক্ত কণাগুলো বৃহস্পতির মেরু অঞ্চলে আটকা পড়ে। বিশাল এই গ্যাসীয় গ্রহটি ঘূর্ণনের সময় এসব আধানযুক্ত কণা শুধু আলোই ছড়ায় না, রেডিও সংকেতও নির্গত করে।
বার্জার বলেন, ‘উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এই কণাগুলো যখন চৌম্বক ক্ষেত্রের ভেতরে ঘুরতে থাকে, তখন অরোরার পাশাপাশি তারা রেডিও তরঙ্গও তৈরি করে।’
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এ ধরনের সংকেতকে ‘অরোরাল রেডিও এমিশন’ বা প্রভার রেডিও নির্গমন বলে থাকেন। এর আগে বৃহস্পতি, শনি ও সূর্যের ক্ষেত্রে এই ঘটনা দেখা গেছে। সৌরজগতের বাইরের বিভিন্ন নক্ষত্র এবং ‘ব্রাউন ডোয়ার্ফ’—অর্থাৎ নক্ষত্র ও গ্রহের মাঝামাঝি ধরনের একটি শীতল বস্তু—এর ক্ষেত্রেও এমন সংকেত শনাক্ত হয়েছে।
বার্জার ও তার সহকর্মীরা ‘বিটা পিক্টোরিস বি’ থেকে মূলত এই ধরনের সংকেতই শনাক্ত করেছেন। তাদের মতে, এটি গ্রহটিতে শক্তিশালী একটি চৌম্বক ক্ষেত্রের উপস্থিতির নির্দেশ দেয় এবং এই চৌম্বক ক্ষেত্রই সেখানকার অরোরা ও রেডিও নির্গমনের মূল কারণ।
বার্জারের মতে, চৌম্বক ক্ষেত্র বহির্গ্রহের গঠন এবং সেসব গ্রহের বায়ুমণ্ডলের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। তিনি বলেন, ‘রেডিও পর্যবেক্ষণ আমাদের সৌরজগতের বাইরের গ্রহগুলো সম্পর্কে সম্পূর্ণ নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি দিতে পারে।’
নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যান্টন প্যানেকোক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক জোসেফ ক্যালিংহাম জানান, এর আগেও বহির্গ্রহ থেকে বেতার তরঙ্গের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। তবে সেসব সংকেত নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। কারণ, ওই সংকেতের উৎস সংশ্লিষ্ট গ্রহের আশ্রয়দাতা নক্ষত্রও হতে পারে—এ সম্ভাবনা পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব হয়নি।
নতুন গবেষণার সঙ্গে যুক্ত না থাকা ক্যালিংহাম একটি ই-মেইলে লিখেছেন, ‘এই গবেষণার বিশেষত্ব হলো, তারা এই বিকিরণকে নক্ষত্র থেকে আলাদা করে সরাসরি গ্রহটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ করতে পেরেছে।’
আমাদের সৌরজগতের বয়স প্রায় ৪৫০ কোটি বছর। এর তুলনায় বিটা পিক্টোরিস নক্ষত্রবিন্যাসের বয়স জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের হিসাবে প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ বছর। অর্থাৎ এটি তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত নবীন একটি নক্ষত্রবিন্যাস।
যে গ্রহটি থেকে সম্ভবত এই বেতার সংকেতের উৎপত্তি হয়েছে, সেই ‘বিটা পিক্টোরিস বি’ ২০০৮ সালে আবিষ্কৃত হয়। এই নক্ষত্রবিন্যাসের আরও দুটি গ্রহ রয়েছে। ‘বিটা পিক্টোরিস সি’ আবিষ্কৃত হয় ২০১৯ সালে এবং ‘বিটা পিক্টোরিস ডি’ আবিষ্কৃত হয়েছে ২০২৬ সালে।
/এসএন