দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে কোরবানির পশুর চামড়া সরকার নির্ধারিত দামে নয়, বরং ট্যানারি মালিকদের নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী কিনছেন স্থানীয় ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। ফলে গরুর চামড়া আকারভেদে মাত্র ১০০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে ছাগলের চামড়ার দাম নেমে এসেছে ৫ থেকে ১০ টাকায়, যা একটি খিলি পানের দামের সমান বলেই মন্তব্য করছেন স্থানীয়রা।
ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় অনেকেই ছাগলের চামড়া বিক্রি না করে ছোট যমুনা নদীতে ফেলে দিয়েছেন। এতে কোরবানির চামড়া বিক্রেতারা প্রত্যাশিত মূল্য থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঈদের দ্বিতীয় দিন শুক্রবার (২৯ মে) ফুলবাড়ী পৌরশহরের নিমতলা মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের পাশে চলছে কোরবানির পশুর চামড়া কেনাবেচা। বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যক্তি পর্যায়ের বিক্রেতা ও এতিমখানার প্রতিনিধিরা চামড়া নিয়ে সেখানে এসেছেন। বিক্রির আশায় এলেও দাম শুনে হতাশ হয়ে পড়েন অনেকেই। সরকার নির্ধারিত মূল্যে চামড়া বিক্রি করতে না পারায় ক্ষোভও প্রকাশ করেন তারা।
জানা গেছে, চলতি বছর কোরবানির পশুর লবণযুক্ত চামড়ার নতুন ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সরকার নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী ঢাকায় গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা, যা গত বছর ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। ঢাকার বাইরে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা, যেখানে গত বছর ছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। এছাড়া সারা দেশে খাসির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ২২ থেকে ২৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বর্গফুটের মাপ ধরে একটি মাঝারি আকারের গরুর চামড়ার মূল্য সাধারণত ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা এবং বড় আকারের চামড়ার মূল্য ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকারও বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু প্রতি বছরের মতো এবারও মাঠপর্যায়ে বিক্রেতারা সরকারের নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় অনেক কম দামে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
প্রতিবছর কোরবানির ঈদে সবচেয়ে বেশি চামড়া সংগ্রহ করে বিভিন্ন মাদরাসা ও এতিমখানা। বহু কোরবানিদাতা স্বেচ্ছায় এসব প্রতিষ্ঠানে পশুর চামড়া দান করেন। পরে সেই চামড়া বিক্রির অর্থ দিয়ে লিল্লাহ বোর্ডিং, এতিমখানা এবং অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও অন্যান্য ব্যয়ের একটি বড় অংশ বহন করা হয়। তবে কয়েক বছর ধরে চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানও আর্থিক চাপে পড়ছে।
চামড়া বিক্রি করতে আসা আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘সরকার চামড়ার দাম বাড়ালেও সেটি শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ, বাস্তবে এর কোনো প্রয়োগ নেই। চামড়ার বাজার আগেও যা ছিল এবারও তা-ই রয়েছে। একটি গরুর চামড়া আর একটি ছাগলের চামড়া এনেছিলাম। গরুর চামড়া বিক্রি করলেও ছাগলের চামড়ার দাম নেই, তাই ফেলে দিয়েছি।’
আরেক কোরবানিদাতা রমজান আলী বলেন, ‘দুইটি ছাগলের চামড়া এনেছিলাম, একটি দশ টাকা দিয়ে বিক্রি করেছি। অন্যটির দাম পাঁচ টাকা বলায় সেটি নদীতে ফেলে দিয়েছি।’
স্থানীয় চামড়া ব্যবসায়ীদের দাবি, মাঠপর্যায়ে চামড়া কেনাবেচা মূলত ট্যানারিগুলোর নির্ধারিত ক্রয়মূল্যের ওপর নির্ভর করে। সরকারের নির্ধারিত মূল্য লবণযুক্ত চামড়ার জন্য হলেও সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে বাড়তি খরচ বহন করতে হয় ব্যবসায়ীদের। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় এ বছর প্রতি বস্তা লবণের দাম ২০০ থেকে ২৫০ টাকা বেড়েছে। এছাড়া লবণ প্রয়োগ, পরিবহন এবং ওঠানামাসহ অন্যান্য ব্যয় মিলিয়ে একটি গরুর চামড়ার পেছনে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত খরচ হয়।
স্থানীয় চামড়া ব্যবসায়ী কোরবান আলী এ পরিস্থিতির জন্য ট্যানারি মালিকদের দায়ী করে বলেন, ‘তারা সরকারি দামে না কেনায় আমরাও কিনতে পারছি না। আমরা আকার ভেদে ১০০ থেকে ৩০০ টাকায় চামড়া কিনছি। ট্যানারির মালিকেরা ছাগলের চামড়া নিতে চায় না। তবুও ছাগলের চামড়া নিচ্ছি ৫-১০ টাকায়। অনেকে খাসির চামড়া নদীতে ফেলে দিয়েছেন। যে পরিমাণ পশু কোরবানি হয়, তা দেশের ট্যানারিগুলোর ধারণক্ষমতার অনেক বেশি। এরপরও তারা সরকার নির্ধারিত মূল্যে চামড়া কিনতে চায় না।’
/এসএন