ব্লাড ক্যানসারের কঠিন চিকিৎসার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে গিয়ে এসএসসি পরীক্ষায় ৯০ শতাংশের বেশি নম্বর পেয়ে জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন ঝালকাঠি সরকারি হরচন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বুশরা মেহজাবীন।বুশরার সাফল্যের গল্প অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। নবম ও দশম শ্রেণির অর্ধেকেরও বেশি সময় তাকে কাটাতে হয়েছে ঢাকার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যানসার ওয়ার্ডে। টানা সাত মাস চলেছে কঠিন চিকিৎসা। এখনও প্রতি মাসে একবার কেমোথেরাপি এবং তিন মাস পরপর বিশেষ কেমোথেরাপি নিতে হয় তাকে।চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় মাসের শেষ দিকে অনেক সময় এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েন বুশরা যে, মাথা সোজা করে রাখাও কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু শারীরিক এই দুর্বলতা তাকে পড়াশোনা থেকে সরিয়ে রাখতে পারেনি।এসএসসি পরীক্ষার আগে চিকিৎসকেরা তাকে হাসপাতালে শুয়ে বিশেষ সুবিধায় পরীক্ষা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে বুশরা সেই সুযোগ নিতে চাননি। অন্য সবার মতো পরীক্ষার হলে বসেই পরীক্ষা দিতে চেয়েছেন তিনি। নিজের সামর্থ্যের ওপর আস্থা রেখে শেষ পর্যন্ত স্বাভাবিক পরিবেশেই পরীক্ষায় অংশ নেন এবং কাঙ্ক্ষিত জিপিএ-৫ অর্জন করেন।২০২৪ সালের ৫ জুলাই বুশরার ব্লাড ক্যানসার শনাক্ত হয়। এরপর দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলছে তার চিকিৎসা। অসুস্থতার মধ্যেও নিজের চেষ্টায় পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন তিনি এবং এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছেন।কঠিন চিকিৎসা, দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকা এবং শারীরিক দুর্বলতার মধ্যেও পড়াশোনার প্রতি তার এই অদম্য আগ্রহের ফল এসেছে এবার। এসএসসি পরীক্ষায় ৯০ শতাংশের বেশি নম্বর নিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছেন বুশরা।নিজের এই সাফল্য উদযাপন করতে রোববার (৪ অক্টোবর) ঝালকাঠিতে শিখো–প্রথম আলো জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি। দীর্ঘদিনের অসুস্থতা, হাসপাতালের ক্যানসার ওয়ার্ড, কেমোথেরাপি ও চিকিৎসার কষ্টের মধ্যেও ওই দিনটিকে আনন্দে কাটিয়েছেন বুশরা।অনুষ্ঠানের আগের রাত থেকেই উচ্ছ্বসিত ছিলেন তিনি। সকালে মাকে ঘুম থেকে তুলে দ্রুত প্রস্তুত হয়ে মায়ের সঙ্গে চলে আসেন ঝালকাঠি সরকারি কলেজের নতুন ভবনের হলরুমে। সেখানে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় তার। এরপর গল্প, হইহুল্লোড় ও সেলফিতে মেতে ওঠেন বুশরা।বুশরার মা মেহেরুন্নেছা বলেন, প্রথম আলোর জিপিএ-৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসে তার মেয়ের শারীরিক কষ্ট যেন অনেকটাই দূর হয়ে গেছে। বন্ধুদের সঙ্গে হইহুল্লোড় ও সেলফি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সে। কয়েক দিন ধরেই মেয়েটি অনুষ্ঠানটির জন্য খুব উচ্ছ্বসিত ছিল।বুশরা বলেন, ব্লাড ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর তাকে জীবনের একটি কঠিন সময় পার করতে হয়েছে। দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছে এবং নিয়মিত কেমোথেরাপি নিতে হয়েছে। অনেক সময় শারীরিকভাবে এতটাই দুর্বল হয়ে পড়তেন যে পড়াশোনা করাও কঠিন হয়ে যেত।তবে অসুস্থতার কারণে নিজের স্বপ্ন থামিয়ে দেওয়ার কথা কখনো ভাবেননি বুশরা। চিকিৎসকেরা হাসপাতালে শুয়ে পরীক্ষা দেওয়ার পরামর্শ দিলেও তিনি অন্য সবার মতো পরীক্ষার হলে বসে পরীক্ষা দিতে চেয়েছেন।বুশরার ভাষায়, নিজের ওপর বিশ্বাস থাকলে কঠিন পরিস্থিতিও জয় করা সম্ভব। তাই যতটা সম্ভব নিজের মতো করে পড়াশোনা করেছেন এবং পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। জিপিএ-৫ পাওয়ার পর সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে মা-বাবার মুখের হাসি দেখে।প্রথম আলোর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসে নিজের ভালো লাগার কথাও জানান বুশরা। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হওয়া, গল্প করা ও ছবি তোলার সুযোগ পেয়ে তিনি আনন্দিত। কয়েক দিন ধরে এই অনুষ্ঠানের জন্য অপেক্ষা করছিলেন তিনি।কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়া অন্যদের উদ্দেশে বুশরার বার্তা—হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না। অসুস্থতা কিংবা কোনো বাধাকেই স্বপ্ন পূরণের পথে থামতে দেওয়া উচিত নয়। ভবিষ্যতে আরও পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে মানুষের জন্য কিছু করতে চান তিনি।ঝালকাঠিতে দেড় শতাধিক কৃতী শিক্ষার্থীর মিলনমেলাপ্রথম আলোর আয়োজনে এবং শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’র পৃষ্ঠপোষকতায় সারা দেশের ৬৪ জেলায় ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে। ‘স্বপ্ন দেখো জীবন গড়ো’ স্লোগানে আয়োজিত এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে রোববার সকালে ঝালকাঠি সরকারি কলেজের নতুন ভবনের হলরুমে অনুষ্ঠিত হয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠান।এতে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দেড় শতাধিক কৃতী শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকেরা অংশ নেন। কেউ মা-বাবার সঙ্গে, কেউ ভাইবোন বা বন্ধুদের নিয়ে অনুষ্ঠানে আসে। দীর্ঘদিন পর পুরোনো সহপাঠীদের সঙ্গে দেখা হয়ে অনেকেই আনন্দে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে। কেউ গল্পে মেতে ওঠে, আবার কেউ স্মরণীয় মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দী করতে ব্যস্ত ছিল।কাঁঠালিয়ার আমুয়া থেকে ৪০-৪৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে অনুষ্ঠানে আসেন রাহায়ে রুহানি। রাজাপুর থেকে আসেন প্রিয়াংকা বিশ্বাস। নলছিটির সুগন্ধা নদী পাড়ি দিয়ে অনুষ্ঠানে যোগ দেন নাফিজা ইসলাম।রাহায়ে রুহানি বলেন, এই অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য গত তিন দিনে কোথাও বেড়াতে যাননি। জীবনে প্রথমবারের মতো এমন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসে তার খুব ভালো লাগছে। অন্য বন্ধুরাও অনুষ্ঠানে এসেছে বলে আনন্দ আরও বেড়েছে।রোববার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। এর আগে কৃতী শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ক্রেস্ট ও উপহার।স্বপ্ন দেখার সাহস ও মানবিক হওয়ার আহ্বানঝালকাঠি বন্ধুসভার সভাপতি শাকিল হাওলাদারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর ঝালকাঠি প্রতিনিধি আ স ম মাহমুদুর রহমান। পরে অতিথিদের মঞ্চে আমন্ত্রণ জানানো হয়।অতিথিরা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে স্বপ্ন দেখার সাহস, অধ্যবসায় এবং মানবিক মূল্যবোধের গুরুত্ব তুলে ধরেন।ঝালকাঠি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আগামীর বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয় প্রজন্ম গড়ে তুলতে প্রথম আলো নিজেদের অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করছে। শিক্ষার্থীদের নিজেদের প্রস্তুত করার পাশাপাশি নিজেদের শক্তির ওপর বিশ্বাস ও আস্থা রাখার আহ্বান জানান তিনি। মানুষের কল্যাণ ও সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে নিজেদের জ্ঞান ও মেধাকে কাজে লাগানোর কথাও বলেন তিনি।ঝালকাঠি প্রেসক্লাবের সভাপতি আক্কাস সিকদার শিক্ষার্থীদের নানা পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, এমনভাবে নিজেদের তৈরি করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে তাদের জ্ঞান ও মেধা পরিবার, সমাজ এবং দেশের মানুষের কাজে আসে।আলোচনা, কুইজ ও পুরস্কার বিতরণের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পরিবেশনাও ছিল অনুষ্ঠানে। কখনো সংগীত, কখনো নৃত্য, আবার কখনো শিক্ষার্থীদের গল্প ও আবৃত্তিতে মুখর হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল।ঝালকাঠি সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ ইলিয়াস ব্যাপারী বলেন, পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করাই চূড়ান্ত সফলতা নয়। ভালো ফলাফলের পাশাপাশি ভালো, নির্মোহ, নিবেদিত ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা এবং দেশপ্রেমে সমৃদ্ধ হওয়া আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের চিকিৎসা কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আরও মনোযোগী ও পরিশ্রমী হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, পড়াশোনার কোনো বিকল্প নেই। শুধু জিপিএ-৫ অর্জনই জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য নয়; আলোকিত মানুষ ও সুনাগরিক হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলাই গুরুত্বপূর্ণ।অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু সাঈদ, ঝালকাঠি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পবিত্র কুমার দাস এবং প্রথম আলো বন্ধুসভার উপদেষ্টা শিক্ষক হামিদা খানম।
/বিএসএস