যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ। তবে এবারের আসর শুধু তিন দেশের যৌথ আয়োজনের কারণেই নয়, বিশ্ব ফুটবলের প্রতিনিধিত্বে বড় পরিবর্তন আনার কারণেও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই বিশ্বকাপে দেখা যাবে বৈশ্বিক ফুটবলের এক নতুন রূপ।
দলসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে এবার বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছে রেকর্ড ১৩টি মুসলিমপ্রধান দেশ। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এত সংখ্যক মুসলিম দেশের অংশগ্রহণ এর আগে কখনো দেখা যায়নি। ফিফার দলসংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত এশিয়া ও আফ্রিকার উদীয়মান ফুটবল শক্তিগুলোর জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়ন, আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ এবং পেশাদার লিগে বিনিয়োগের ফল হিসেবেই এসব দেশ বিশ্বমঞ্চে নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করেছে।
কাতার বিশ্বকাপে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়া মরক্কো এবারও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। উত্তর আফ্রিকার এই দলটি ইতোমধ্যেই বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তিদের হারানোর সামর্থ্য দেখিয়েছে। ফলে ২০২৬ বিশ্বকাপেও তাদের দিকে বিশেষ নজর থাকবে ফুটবলপ্রেমীদের।
দীর্ঘ ৪০ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বকাপে ফিরছে ইরাক। চার দশক পর তাদের এই প্রত্যাবর্তন শুধু দেশটির জন্য নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ফুটবলের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইউরোপের শক্তিশালী ফুটবল দেশ তুরস্কও ২৪ বছরের অপেক্ষা শেষে বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেছে। ইউরোপীয় লিগে খেলা তারকাদের সমন্বয়ে গড়া দলটি বিশ্বমঞ্চে বড় চমক দেখাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী দল সেনেগাল আবারও নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণের সুযোগ পাচ্ছে। গতি, শারীরিক সক্ষমতা এবং বিশ্বমানের খেলোয়াড়দের নিয়ে তারা যেকোনো দলের জন্য কঠিন প্রতিপক্ষ হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বকাপের অন্যতম নতুন মুখ জর্ডান। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও পরিকল্পনার ফল হিসেবে তারা প্রথমবারের মতো বিশ্বমঞ্চে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে প্রস্তুত।
মধ্য এশিয়ার প্রতিনিধি উজবেকিস্তানও আধুনিক ফুটবল অবকাঠামো ও পেশাদার লিগে বিনিয়োগের সুফল পেয়েছে। তাদের বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়া নতুন ফুটবল শক্তির উত্থানের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী ফুটবল শক্তি মিশর কোয়ালিফায়ারে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে মূল পর্বে জায়গা নিশ্চিত করেছে। তাদের আক্রমণভাগ বরাবরই প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়।
উত্তর আফ্রিকার আরেক দল আলজেরিয়া তাদের টেকনিক্যাল ফুটবল, দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাক এবং ড্রিবলিং দক্ষতার জন্য পরিচিত। বিশ্বকাপে তাদের উপস্থিতি টুর্নামেন্টে বাড়তি আকর্ষণ যোগ করবে।
সৌদি আরব সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজেদের ঘরোয়া ফুটবল কাঠামোয় বড় পরিবর্তন এনেছে। অতীতেও তারা বড় দলগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। এবারও বিশ্বমঞ্চে নিজেদের সামর্থ্য দেখাতে প্রস্তুত মধ্যপ্রাচ্যের দলটি।
স্বাগতিক হওয়ার সুবিধা ছাড়াই এবার নিজেদের যোগ্যতায় বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে কাতার। সাম্প্রতিক বছরগুলোর আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং সুশৃঙ্খল রণকৌশল তাদেরকে একটি প্রতিযোগিতামূলক দলে পরিণত করেছে।
এশিয়ার অন্যতম ধারাবাহিক দল ইরানও এবার বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে। শারীরিক শক্তি, সংগঠিত রক্ষণভাগ এবং লড়াকু মানসিকতার কারণে তারা প্রতিপক্ষের জন্য সবসময়ই কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকে।
আফ্রিকার আরেক পরিচিত শক্তি তিউনিসিয়া আধুনিক ইউরোপীয় কৌশল ও উত্তর আফ্রিকার টেকনিক্যাল ফুটবলের সমন্বয়ে নিজেদের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে। আন্ডারডগ হিসেবে তারা অনেক সময় বড় দলগুলোর জন্যও বিপদ ডেকে আনতে পারে।
এদিকে ইউরোপের বৈচিত্র্যময় দল বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাও বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে। শারীরিক সক্ষমতা ও আধুনিক বল নিয়ন্ত্রণ কৌশলের সমন্বয়ে দলটি টুর্নামেন্টে ভিন্ন মাত্রা যোগ করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, ১৩টি মুসলিমপ্রধান দেশের অংশগ্রহণ শুধু সংখ্যার দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়; এটি বিশ্বকাপে কৌশলগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যও বৃদ্ধি করবে। উত্তর আফ্রিকার টেকনিক্যাল ফুটবল, মধ্যপ্রাচ্যের সুশৃঙ্খল রক্ষণাত্মক কৌশল এবং মধ্য এশিয়ার শক্তিনির্ভর ফুটবলের সমন্বয়ে দর্শকরা এবার ভিন্নধর্মী ফুটবল দর্শনের অভিজ্ঞতা পাবেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি এই অংশগ্রহণের সাংস্কৃতিক গুরুত্বও অনেক। মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর রেকর্ড উপস্থিতি বিশ্বমঞ্চে তাদের ইতিবাচক প্রতিনিধিত্ব তুলে ধরবে এবং এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের কোটি কোটি দর্শককে আরও গভীরভাবে বিশ্বকাপের সঙ্গে যুক্ত করবে। ২০২৬ সালের জুনে উত্তর আমেরিকাজুড়ে শুরু হওয়া ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই ফুটবল উৎসবের পর্দা নামবে জুলাই মাসের ফাইনালের মধ্য দিয়ে।
/এসএন