বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নতুন সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন সাবেক জাতীয় দলের অধিনায়ক তামিম ইকবাল। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর আগামী চার বছরের জন্য তিনি দেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক দায়িত্বে নির্বাচিত হন।
আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন আগের বোর্ড অপসারণের পর পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন আয়োজনের জন্য যে ১১ সদস্যের অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়েছিল, তারও প্রধান ছিলেন তামিম। তাঁর নেতৃত্বেই গতকাল মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বিসিবির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রশাসনের অতীত ধারাবাহিকতার মতো এবারের নির্বাচনও রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে ছিল না বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। কাউন্সিলর মনোনয়ন থেকে শুরু করে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ নিয়ে সমালোচনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনা অনুযায়ী বিসিবির ২১তম সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন তামিম।
বিসিবির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে সীমিত কিছু পদে। জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলো নিয়ে গঠিত ক্যাটাগরি-১–এর ১০ পরিচালকের মধ্যে সাতজন আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। সাতটি বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার মধ্যে শুধু খুলনা ও বরিশাল বিভাগে ভোটগ্রহণ হয়।
বরিশাল থেকে পরিচালক নির্বাচিত হয়েছেন বিপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজি ফরচুন বরিশালের মালিক মিজানুর রহমান। খুলনা থেকে নির্বাচিত হয়েছেন শফিকুল আলম ও শান্তনু ইসলাম।
অন্যদিকে ঢাকার ক্লাবগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী ক্যাটাগরি-২–এ ১২টি পরিচালক পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ১৬ জন প্রার্থী। এই শ্রেণিতে সর্বোচ্চ ৭৩ ভোট পেয়েছেন ওল্ড ডিওএইচএসের কাউন্সিলর তামিম। সবচেয়ে বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে ১২তম পরিচালক পদটি নিয়ে। ৪১ ভোট পেয়ে সরকার মাহবুব আহমেদ শেষ নির্বাচিত পরিচালক হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সৈয়দ বোরহানুল হোসেন মাত্র এক ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। ক্যাটাগরি-৩–এ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সিলর সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন।
নির্বাচনের পর সংবাদ সম্মেলনে ‘বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ড’ প্রসঙ্গও উঠে আসে। সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের সন্তানদের উপস্থিতি নিয়ে সমালোচনার প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ তামিমের অ্যাডহক কমিটিকে ‘বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ড’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। পরে এই মন্তব্য ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে তামিম হাসিমুখে বলেন, ‘অনেকে অনেক ধরনের ট্যাগ দিচ্ছে, এটা অবশ্যই তাদের ব্যক্তিগত মত। দেখি, বাপের দোয়া থেকে ক্রিকেটের দোয়া করতে পারি কি না ভবিষ্যতে।’
তবে দায়িত্ব গ্রহণের পর নিজের অগ্রাধিকার সম্পর্কে পরিষ্কার অবস্থান তুলে ধরেন নতুন সভাপতি। তিনি বলেন, পরিচালকদের ব্যক্তিগত পরিচয় যাই থাকুক না কেন, সবার দায়িত্ব একটাই—বাংলাদেশ ক্রিকেটের সেবা করা এবং দেশের ক্রিকেটকে এগিয়ে নেওয়া।
তামিম বলেন, ‘আমি একটা জিনিস একদম স্পষ্ট করে বলেছি যে (পরিচালকদের), আপনাদের ব্যক্তিগত পরিচয় যা–ই থাকুক না কেন, আমাদের দায়িত্ব একটাই; আর ওই দায়িত্বের কারণেই আমরা এখানে আজকে বসা। ওটা হলো বাংলাদেশ ক্রিকেটের সেবা করা, বাংলাদেশ ক্রিকেটকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।’
একই সঙ্গে গত এক থেকে দেড় বছরে দেশের ক্রিকেটের যে ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা পুনরুদ্ধারে নতুন বোর্ড কাজ করবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে আমিনুল ইসলামের অধীনে গত ৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার অভিযোগ ওঠার পর জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। সেই কমিটি নির্বাচনী স্বচ্ছতা বাড়াতে গঠনতন্ত্রে কিছু পরিবর্তনের সুপারিশও করেছিল। তবে এবারের নির্বাচনে সেসব সুপারিশ কার্যকর হয়নি।
ভবিষ্যতে এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তামিম জানান, বিসিবির সাধারণ পরিষদে আলোচনা করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
নতুন সভাপতির অন্যতম বড় পরিকল্পনা একটি পূর্ণাঙ্গ হাইপারফরম্যান্স সেন্টার গড়ে তোলা। এ বিষয়ে তিনি জানান, কয়েক বছর আগে পূর্বাচলে স্টেডিয়াম ও হাইপারফরম্যান্স সেন্টার নির্মাণের নকশা প্রস্তুত করেছিল অস্ট্রেলিয়ার প্রতিষ্ঠান পপুলাস। এ জন্য বিসিবি তাদের অর্থও পরিশোধ করেছে। তবে সেই নকশা তাঁর পছন্দ হয়নি।
তামিম জানান, নকশা সংশোধনের বিষয়ে আলোচনা করতে পপুলাসকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তাঁর আশা, প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিরা ঢাকায় এলে দ্রুত আলোচনা সম্পন্ন করে হাইপারফরম্যান্স সেন্টার নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের সহযোগিতাও প্রত্যাশা করেন তিনি।