বিশ্বকাপ ফুটবল এলেই বদলে যায় বাংলাদেশের চেনা দৃশ্যপট। বাড়ির ছাদ, দোকানপাট, অফিস কিংবা রাস্তার দুই পাশে উড়তে থাকে প্রিয় দলের পতাকা। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দল ও ব্রাজিল জাতীয় ফুটবল দল সমর্থকদের উন্মাদনা যেন অন্য মাত্রা পায়।তবে এই উন্মাদনাই কখনও কখনও ডেকে আনে ভয়াবহ বিপর্যয়।
ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার সিন্দুরপুর ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামের আবদুল মতিনের জীবন তারই এক নির্মম উদাহরণ। প্রিয় দল আর্জেন্টিনার পতাকা উড়াতে গিয়ে চিরতরে হারিয়েছেন নিজের দুই হাত ও দুই পা।২০১৪ সালের ২৮ মার্চ, বিশ্বকাপ শুরুর কয়েকদিন আগে লক্ষ্মীপুর শহরের আজিম শাহ মার্কেটের তিনতলা ভবনের ছাদে পতাকা টানানোর কাজ করছিলেন মতিন।
অ্যালুমিনিয়ামের একটি রড দিয়ে পতাকা উড়াতে গিয়ে সেটি হঠাৎ বিদ্যুতের প্রধান সঞ্চালন লাইনের সঙ্গে স্পর্শ করে। মুহূর্তেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ছিটকে পড়েন তিনি।গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। পরে তাকে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে। টানা ২৭ দিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকার পর শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসা। কিন্তু শরীরে মারাত্মক সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় শেষ পর্যন্ত কেটে ফেলতে হয় তার দুই হাত ও দুই পা।
চিকিৎসায় খরচ হয় প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা। হারিয়ে যায় ব্যবসা-বাণিজ্য, স্বাভাবিক জীবন—সবকিছু।তবুও ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা এতটুকুও কমেনি মতিনের। এখনও তিনি স্বপ্ন দেখেন গ্যালারিতে বসে প্রিয় দল আর্জেন্টিনার খেলা দেখার। দেখতে চান লিওনেল মেসি-কে কাছ থেকে।মতিন বলেন, “নিজের পছন্দের দলের প্রতি উন্মাদনা দেখাতে গিয়ে আজ আমি সব হারিয়েছি। তারপরও একটা স্বপ্ন আছে—একদিন গ্যালারিতে বসে মেসিদের খেলা দেখবো।
মেসিকে একবার ছুঁয়ে দেখতে চাই।”তার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি এখন স্ত্রী ফাতেমা। দুর্ঘটনার পর যখন সবাই দূরে সরে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল, তখনও ভালোবাসার মানুষটিকে ছেড়ে যাননি তিনি। পরিবারের অমতেই বিয়ে করেন মতিনকে। এখন খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে দৈনন্দিন সব কাজে স্বামীকে সহায়তা করেন ফাতেমা।মতিন বলেন, “দুর্ঘটনার পর মনে হয়েছিল ফাতেমা হয়তো আর থাকবে না।
কিন্তু সে উল্টো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সাহস হয়ে দাঁড়িয়েছে।”তাদের সংসারে আছে ১০ বছর বয়সী এক কন্যাসন্তান—জান্নাতুল ঝুমুর। সীমাহীন কষ্টের মধ্যেও পরিবারটিকে আঁকড়ে বেঁচে আছেন মতিন।ফাতেমা বলেন, “মানুষটাকে ভালোবাসি। যতদিন বেঁচে আছি, তাকে ভালোবেসে সেবা করে যেতে চাই।”
আর্জেন্টিনাপ্রেমী মতিনের গল্প ইতোমধ্যে অনেকের হৃদয় ছুঁয়েছে। বিভিন্ন সময় খ্যাতিমান ব্যক্তিরা তাকে দেখতে গেছেন। এমনকি বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা দূতাবাস থেকেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।তবে নিজের জীবনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে সবার প্রতি একটি অনুরোধ জানিয়েছেন মতিন—ফুটবল উন্মাদনা যেন কখনও জীবনের জন্য হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়।
/বিএসএস