• ঢাকা
  • সোমবার, ০৩ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম


সামর্থ্যবানদের জন্য কুরবানি কেন জরুরি

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ ১০:৫২ পিএম

‘উদহিয়াহ’ বা কুরবানি—আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক মহান ইবাদত। কুরবানি বলতে বোঝায় নির্ধারিত দিনগুলোতে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে উট, গরু, ছাগল বা ভেড়া জবাই করা। এটি কেবল আনুষ্ঠানিক কোনো কাজ নয়; বরং এর মাধ্যমে একজন বান্দা তার ভালোবাসা, আনুগত্য ও আত্মত্যাগের প্রমাণ দেয়। সাধারণভাবে, আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্যে সম্পাদিত যেকোনো কাজই কুরবানির অন্তর্ভুক্ত হলেও শরিয়তের নির্দিষ্ট বিধান অনুযায়ী পশু জবাই করার এই ইবাদতই কুরবানি হিসেবে পরিচিত। কুরবানি করার উত্তম সময় হলো জিলহজ মাসের ১০ তারিখ, ঈদের নামাজের পর থেকে নির্ধারিত দিনগুলো পর্যন্ত।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা নামাজ ও কুরবানির নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘অতএব তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামাজ পড় এবং কুরবানি করো।’ (সুরা কাউসার: ২)। এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, নামাজ ও কুরবানি—দুটি ইবাদতই আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের প্রতীক। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিজেও নিয়মিত কুরবানি করেছেন এবং কখনো তা পরিত্যাগ করেননি। হাদিসে এসেছে, তিনি মদিনায় অবস্থানকালে প্রতি বছর কুরবানি করেছেন এবং নিজ হাতে সাদা-কালো রঙের দুটি দুম্বা জবাই করেছেন।

কুরবানির সময় ও নিয়ম সম্পর্কেও হাদিসে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈদের নামাজের আগে জবাই করে, সে নিজের জন্য জবাই করে; আর যে নামাজের পরে জবাই করে, তার কুরবানি সম্পন্ন হয় এবং সে মুসলমানদের সুন্নাহ অনুসরণ করে।’ একইভাবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, যার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি করে না, সে যেন ঈদগাহের কাছেও না আসে—যা এই ইবাদতের গুরুত্বকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

কুরবানি ওয়াজিব না সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ—এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কিছু আলেম এটিকে ওয়াজিব মনে করলেও অধিকাংশের মতে এটি সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। তবে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি ত্যাগ না করাই উত্তম। অন্যের সহযোগিতায় কুরবানি আদায় করলে তা সহীহ হবে এবং উভয়েই সওয়াব পাবে। তবে ঋণ করে কুরবানি দেওয়া আবশ্যক নয়। কেউ যদি অন্যের পক্ষ থেকে কুরবানি করে, তাহলে তার নিজের পক্ষের কুরবানি আদায় হবে না—এ বিষয়টিও মনে রাখা জরুরি।

প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিমের উচিত নিজের ও পরিবারের পক্ষ থেকে কুরবানি করা। কুরবানি বাদ দিয়ে শুধু সদকা করলেই এর বিকল্প পূরণ হয় না। যেমন হজের পরিবর্তে অর্থ সদকা করলে ফরজ আদায় হয় না, তেমনি কুরবানির ক্ষেত্রেও পশু জবাইয়ের এই নির্দিষ্ট ইবাদতের বিকল্প নেই। ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, কুরবানি করা তার সমমূল্যের অর্থ সদকা করার চেয়েও উত্তম, কারণ এটি একটি নির্ধারিত ইবাদত।

জীবিত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানি করা উত্তম হলেও সে চাইলে তার সওয়াবে মৃত বা জীবিত আত্মীয়দের অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। মহানবী (সা.) নিজের ও তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে কুরবানি করার সময় দোয়া করতেন। তবে মৃত ব্যক্তির জন্য আলাদাভাবে কুরবানি নির্ধারণ না করে নিজের কুরবানির সঙ্গে তাদের অন্তর্ভুক্ত করাই উত্তম। যদি কেউ মৃত্যুর আগে তার সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ থেকে কুরবানি করার অসিয়ত করে যান, তবে তা বাস্তবায়ন করা ওয়াজিব এবং এই অর্থ অন্য খাতে ব্যয় করা যাবে না।

মুসাফির অবস্থাতেও কুরবানি করা বৈধ। হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) মিনায় অবস্থানকালে তাঁর স্ত্রীদের পক্ষ থেকে কুরবানি করেছেন। এতে বোঝা যায়, ভ্রমণরত অবস্থায়ও এই ইবাদত পালন করা যায়।

কুরবানি শুধু পশু জবাইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ত্যাগ, আত্মসমর্পণ ও আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসার প্রতীক। হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর আত্মত্যাগের ঘটনা আমাদের শেখায়—আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সবকিছু ত্যাগ করাই প্রকৃত সফলতা। তাই প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিমের উচিত আন্তরিক নিয়ত, শুদ্ধ নিয়ম ও পরিপূর্ণ একাগ্রতার সঙ্গে কুরবানি আদায় করা এবং এর মাধ্যমে নিজের জীবনকে আল্লাহর পথে নিবেদিত করার অঙ্গীকার করা।