• ঢাকা
  • শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৩৫ পিএম


মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ থেকে বিগ ব্যাং: মহাকাশ নিয়ে কোরআনের তিন বিস্ময়কর তথ্য

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৭ নভেম্বর ২০২৬ ১:১৯ পিএম

মানবজাতির হেদায়েত এবং পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থার চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা হলো পবিত্র কোরআন। এটি মূলত জ্যোতির্বিজ্ঞানের কোনো গ্রন্থ নয়। তবে সৃষ্টিজগতের অন্তরালে মহান আল্লাহর অসীম ক্ষমতা ও মহিমা তুলে ধরতে গিয়ে এতে মহাবিশ্ব, গ্রহ-নক্ষত্র এবং প্রকৃতির নানা বিস্ময়কর বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে। এসব বর্ণনার অনেক কিছুই দেড় হাজার বছর আগের মানবসভ্যতার চিন্তা ও কল্পনার বাইরে ছিল।

আধুনিক বিজ্ঞান অত্যাধুনিক টেলিস্কোপ ও প্রযুক্তির সহায়তায় মহাকাশ সম্পর্কে যেসব তথ্য উদ্ঘাটন করছে, কোরআনে সেসব বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন বর্ণনা বহু শতাব্দী ধরেই রয়েছে।

মহাকাশ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে উল্লেখিত এমন তিনটি বিস্ময়কর তথ্য তুলে ধরা হলো।

১. মহাবিশ্বের ক্রমাগত সম্প্রসারণ

প্রাচীনকালের বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের মধ্যে প্রচলিত ধারণা ছিল, মহাবিশ্ব স্থির অথবা এর আকার অপরিবর্তনশীল। তবে ১৯২৯ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডউইন হাবল টেলিস্কোপের মাধ্যমে প্রমাণ করেন, মহাবিশ্ব স্থির নয়। বরং গ্যালাক্সিগুলো একে অপরের কাছ থেকে ক্রমাগত দূরে সরে যাচ্ছে। অর্থাৎ মহাবিশ্ব প্রতিনিয়ত সম্প্রসারিত হচ্ছে।

আধুনিক বিজ্ঞানের এই ‘এক্সপান্ডিং ইউনিভার্স’ বা সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের ধারণার উল্লেখ কোরআনেও রয়েছে।

এ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি স্বীয় ক্ষমতায় আকাশ নির্মাণ করেছি এবং আমিই এর সম্প্রসারণকারী।’ (সুরা জারিয়াত, আয়াত: ৪৭)

ইবনে কাসির এই আয়াতের ‘ইন্না লামুসিউন’ (আমিই এর সম্প্রসারণকারী) অংশের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, ‘এর অর্থ হলো, আমি এর প্রশস্ততা বৃদ্ধি করেছি এবং আকাশকে পৃথিবীর ওপরে অনেক উঁচুতে ও বিশাল করে স্থাপন করেছি।’ (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ৭/৪২৫, দারু তাইয়িবাহ, রিয়াদ, ১৯৯৯)

২. মহাজাগতিক বস্তুগুলোর নিজস্ব কক্ষপথে পরিভ্রমণ

একসময় মানুষের ধারণা ছিল, পৃথিবী স্থির রয়েছে এবং সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞানীদের ধারণা পরিবর্তিত হয়। তখন মনে করা হতো, সূর্য স্থির অবস্থানে রয়েছে এবং পৃথিবী তার চারদিকে ঘুরছে।

তবে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান জানিয়েছে, সূর্যও স্থির নয়। বরং পুরো সৌরজগৎকে সঙ্গে নিয়ে এটি মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথে বিপুল গতিতে পরিভ্রমণ করছে।

মহাজাগতিক বস্তুগুলোর এই চলমান অবস্থার কথা কোরআনে বহু আগে থেকেই উল্লেখ রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তিনিই রাত ও দিন এবং সূর্য ও চাঁদ সৃষ্টি করেছেন; প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে বিচরণ করছে।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৩৩)

তাফসিরগ্রন্থে আয়াতের ‘ইয়াসবাহুন’ শব্দটির অর্থ ও ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, শব্দটির অর্থ সাঁতার কাটা বা বিচরণ করা। অর্থাৎ মহাজাগতিক বস্তুগুলো মহাশূন্যে এমনভাবে ভাসমান বা চলমান, যেমন পানিতে কোনো কিছু সাঁতার কাটে বা চলাচল করে। এগুলো শূন্যে স্থির অবস্থায় থাকে না।

এ বিষয়ে তাফসিরে বলা হয়েছে, ‘তারা মহাশূন্যে এমনভাবে ভাসমান বা চলমান, যেমন পানিতে কোনো কিছু সাঁতার কাটে বা চলমান থাকে। অর্থাৎ তারা শূন্যে স্থির নয়।’ (আল-কুরতুবি, আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন, ১১/২৮৬, দারুল কুতুবিল মিসরিয়্যাহ, কায়রো, ১৯৬৪)

৩. মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও প্রাথমিক সংযুক্ত অবস্থা

মহাবিশ্বের উৎপত্তি সম্পর্কে আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম আলোচিত তত্ত্ব হলো ‘বিগ ব্যাং’ বা মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, সৃষ্টির শুরুতে সমগ্র মহাবিশ্ব অত্যন্ত উত্তপ্ত ও ঘন একটি বিন্দুতে পুঞ্জীভূত ছিল, যাকে বলা হয় ‘সিঙ্গুলারিটি’। পরবর্তী সময়ে এক মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে সেই অবস্থা থেকে মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয় এবং বিভিন্ন অংশ আলাদা হয়ে যায়।

পবিত্র কোরআনের একটি আয়াতেও মহাবিশ্বের প্রাথমিক অবস্থায় আসমান ও জমিনের একসঙ্গে সংযুক্ত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা কুফরি করে, তারা কি ভেবে দেখে না যে আসমান ও জমিন (মহাবিশ্ব) এক বিন্দুতে মিশে (ওতপ্রোতভাবে যুক্ত) ছিল, অতঃপর আমিই তাদের আলাদা করে দিয়েছি…।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৩০)

ইমাম তাবারি এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, ‘আসমান ও জমিন সৃষ্টির শুরুতে পরস্পর জোড়া লাগানো ছিল, তাদের মাঝে কোনো ফাঁকা স্থান ছিল না, এরপর আল্লাহ বাতাস বা শক্তির মাধ্যমে তাদের আলাদা করে শূন্যস্থানের সৃষ্টি করেন।’ (আত-তাবারি, জামিউল বয়ান ফি তাফসিরিল কুরআন, ১৭/১১, মুআসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ২০০০)

মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ, মহাজাগতিক বস্তুগুলোর নিজ নিজ কক্ষপথে পরিভ্রমণ এবং সৃষ্টির শুরুতে আসমান ও জমিনের সংযুক্ত অবস্থার মতো বিষয়গুলো কোরআনে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এসব মহাজাগতিক বর্ণনা বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়, এই গ্রন্থ কোনো মানুষের রচনা নয়; বরং এটি এমন এক সত্তার পক্ষ থেকে নাজিল হয়েছে, যিনি সুবিশাল মহাবিশ্বের একচ্ছত্র স্রষ্টা ও নিয়ন্ত্রক।

/এসএন