• ঢাকা
  • সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:১৩ পিএম


কা’লো জা’দুতে আক্রা’ন্ত হওয়ার ১০ লক্ষণ ও তা থেকে বাঁচার ৫ আমল

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২ নভেম্বর ২০২৬ ৬:২৫ এএম

জাদু ইসলামে নিষিদ্ধ ও শয়তানি কাজ হিসেবে বিবেচিত। ব্যক্তিগত স্বার্থ, হিংসা কিংবা প্রতিশোধের বশবর্তী হয়ে কিছু মানুষ অন্যের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে এ ধরনের কাজে জড়িয়ে পড়ে। কুফরি কালাম, তাবিজ-কবজ ও কালো জাদুর চর্চার মাধ্যমে অন্যের অনিষ্ট করার প্রবণতা সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। ব্ল্যাক ম্যাজিকের মতো নিকৃষ্ট পন্থা অবলম্বন করে কেউ কেউ অন্যের ক্ষতি করতে চায়।

জাদুর মাধ্যমে মানুষকে বিভ্রান্ত করা, পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি, অসুস্থ করে তোলা কিংবা মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে পারে। যুগে যুগে শয়তানের প্ররোচনায় মানুষ এ ধরনের অপকর্মে জড়িয়েছে।

কারও ওপর কালো জাদুর প্রভাব রয়েছে বলে মনে করা হলে তাঁর মধ্যে শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক নানা অস্বাভাবিকতার কথা উল্লেখ করা হয়। এমন ১০টি লক্ষণ তুলে ধরা হলো—

কালো জাদুতে আক্রান্ত হওয়ার ১০টি লক্ষণ

১. অস্বাভাবিক শারীরিক সমস্যা: হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়া কিংবা তীব্র মাথাব্যথা দেখা দেওয়া, অথচ চিকিৎসা পরীক্ষায় সমস্যার কারণ শনাক্ত না হওয়া। এ ছাড়া শরীরে অকারণে দুর্বলতা, নির্দিষ্ট স্থানে ব্যথা কিংবা অবশ ভাব অনুভূত হতে পারে।

২. অস্বস্তিকর স্বপ্ন ও আচরণ: বারবার ভয়ংকর স্বপ্ন দেখা, ঘুমের মধ্যে চিৎকার করা, সব সময় ঝিমুনি ভাব থাকা, অনবরত হাই তোলা এবং কান্নাকাটি করার মতো আচরণ দেখা দিতে পারে।

৩. একাকিত্ব ও বিষণ্নতা: কোনো কারণ ছাড়াই রাগ বা ভয় অনুভব করা, সব সময় একা থাকতে চাওয়া এবং ক্ষুধামন্দায় ভোগার বিষয়গুলোও সম্ভাব্য লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

৪. অস্বাভাবিক আচরণ ও আলসেমি: নিজের অজান্তে অদ্ভুত শব্দ করা কিংবা ঘরসংসার ও স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা।

৫. দাম্পত্য জীবনে অশান্তি: কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অস্বাভাবিক ঘৃণা ও দূরত্ব তৈরি হওয়া। একই সঙ্গে দৈহিক সম্পর্কের প্রতি চরম অনীহাও দেখা দিতে পারে।

৬. ধর্মীয় কাজে অনীহা বা অস্বস্তি: কোরআন তিলাওয়াত শুনতে কিংবা নিজে পাঠ করতে কষ্ট হওয়া এবং নামাজ ও জিকিরের সময় চরম অস্বস্তি অনুভব করা।

৭. পারিবারিক পরিবেশে অশান্তি: বাড়িতে অকারণে ঝগড়া-বিবাদ কিংবা দুর্ঘটনা ঘটার পাশাপাশি সাপ বা কালো কুকুরের মতো বিষাক্ত বা কালো প্রাণীর অস্বাভাবিক উপস্থিতির বিষয়টিও লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

৮. অতিপ্রাকৃত ঘটনা অনুভব করা: অদৃশ্য কোনো উৎস থেকে শব্দ শোনা, ছায়া দেখতে পাওয়া কিংবা ঘরের জিনিসপত্র রহস্যজনকভাবে হারিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে।

৯. শরীরে অস্বাভাবিক পরিবর্তন: হঠাৎ চেহারা বা চুলে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দেওয়া। এ ছাড়া চিকিৎসায় নিরাময় করা যায় না—এমন নীলচে-কালো দাগ শরীরে তৈরি হতে পারে।

১০. রুকইয়াহ চলাকালে প্রতিক্রিয়া: কোরআনের আয়াত ও দোয়ার মাধ্যমে রুকইয়াহ বা ঝাড়ফুঁক করার সময় প্রচণ্ড মাথাব্যথা, বমি কিংবা অস্থিরতার মতো প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

কালো জাদুর ক্ষতি থেকে বাঁচার ৫টি আমল

ইসলামে জাদুর অনিষ্ট থেকে সুরক্ষার জন্য কোরআনের নির্দিষ্ট আয়াত ও হাদিসে বর্ণিত বিভিন্ন দোয়া পাঠের নির্দেশনা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) অসুস্থ সাহাবিদের জন্য ঝাড়ফুঁক করতেন এবং বিশেষ দোয়া পড়তেন। তাঁর ওপরও একবার জাদু করা হয়েছিল বলে বর্ণনায় এসেছে। সে সময় সুরা নাস, সুরা ফালাকসহ বিভিন্ন দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে আশ্রয় ও আরোগ্য প্রার্থনা করা হয়। এসব নির্দেশনায় জাদুর ক্ষতি থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

১. সকাল-সন্ধ্যায় তিনবার বিশেষ দোয়া পাঠ

উসমান ইবনে আফফান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় তিনবার নিচের দোয়াটি পাঠ করবে, কোনো কিছুই তার অনিষ্ট করতে পারবে না।

দোয়া:

بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ

উচ্চারণ: বিসমিল্লাহিল্লাজি লা-ইয়াদুররু মাআস্‌মিহি শাইয়্যিন ফিল আরদি ওয়ালা ফিস-সামায়ি ওয়া-হুয়াস-সামিউল আলিম।

অর্থ: আমি আল্লাহর নাম নিচ্ছি। জমিন ও আসমানের কোনো কিছুই যার নামের বরকতে ক্ষতি সাধন করতে পারে না। তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।

(তিরমিজি: ৩৩৮৮)

২. আল্লাহর সৃষ্টির অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়ার দোয়া

সকাল-সন্ধ্যায় পড়ার জন্য আরেকটি দোয়া হলো—

أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ

উচ্চারণ: আউজু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিনশাররি মা খালাকা।

অর্থ: আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীর অসিলায় তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তার মন্দ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।

হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, সন্ধ্যার সময় এ দোয়া পাঠ করলে ওই রাতে সাপ-বিচ্ছু ইত্যাদি ক্ষতি করতে পারে না।

(তিরমিজি: ৩৪৩৭)

৩. অসুস্থতা ও অনিষ্ট থেকে আরোগ্যের দোয়া

জাদু দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনায় জিবরাইল (আ.) নবীজি (সা.)-কে এ দোয়া পড়ে ফুঁ দিয়েছিলেন বলে বর্ণনা রয়েছে।

দোয়া:

بِاسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ مِنْ كُلِّ شَىْءٍ يُؤْذِيكَ مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ اللَّهُ يَشْفِيكَ بِاسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ

উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি আরক্বিকা মিন কুল্লি শাইয়্যিন ইয়্যুজিকা মিন শাররি কুল্লি নাফসিন আও আইনিন হা-সিদিন, আল্লাহু ইয়াশফিকা বিসমিল্লাহি আরক্বিকা।

অর্থ: আল্লাহর নামে আমি আপনাকে ঝাড়ফুঁক করছি, সকল কষ্টদায়ক বিষয় থেকে এবং প্রত্যেক আত্মা ও ঈর্ষাপরায়ণ চক্ষুর অনিষ্ট থেকে। আল্লাহ আপনাকে আরোগ্য করুন। আল্লাহর নামে আমি আপনাকে ঝাড়ফুঁক করছি।

(সহিহ মুসলিম: ২১৮৬, তিরমিজি: ৯৭২)

৪. সুরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পাঠ

জাদু ও অনিষ্ট থেকে সুরক্ষার জন্য সুরা ফালাক ও সুরা নাস বিশেষভাবে উপকারী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আলেমরা সকাল ও সন্ধ্যায় সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক এবং সুরা নাস—প্রতিটি তিনবার করে পাঠ করার পরামর্শ দেন।

৫. সুরা ফাতিহা পাঠ

সুরা ফাতিহার আরেকটি নাম ‘সুরা শিফা’, অর্থাৎ আরোগ্য লাভের সুরা। অসুস্থতা ও আরোগ্যের জন্য এ সুরা পাঠ করা যেতে পারে।

নবী করিম (সা.)-এর ওপর জাদু প্রয়োগের ঘটনার প্রসঙ্গেও তাঁর জন্য ঝাড়ফুঁকের দোয়া পাঠের কথা উল্লেখ রয়েছে। সে সময় ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) তাঁকে যে দোয়াটি শিখিয়েছিলেন, তা হলো—

‘বিসমিল্লাহি আরকিকা। মিন কুল্লি শাইয়িন ইউজিকা। ওয়া মিন শাররি কুল্লি নাফসিন আও আইনিন হাসিদিন, আল্লাহু ইয়াশফিক। বিসমিল্লাহি আরকিক।’

(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১৮৬)

সুরা ফাতিহা ‘সুরা শিফা’ নামে পরিচিত। তাই আরোগ্যের উদ্দেশ্যে এ সুরা পাঠের কথাও বলা হয়েছে।

জাদু, কুফরি এবং শয়তানের প্ররোচনা থেকে বাঁচতে ইমান ও পবিত্রতা বজায় রাখা এবং মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ইসলামে কালো জাদুর অবস্থান

ইসলামে কালো জাদু বা ক্ষতিকর তন্ত্রমন্ত্র সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং কুফরি কাজ হিসেবে বিবেচিত। ইচ্ছাকৃতভাবে এ ধরনের কাজে জড়িত হওয়া গুরুতর পাপ। এ থেকে ফিরে এসে অনুশোচনা ও তওবা করা জরুরি। মূল লেখায় এ ধরনের কাজের জন্য ইসলামী আইনে কঠোর দণ্ডের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

নবী করিম (সা.) সাতটি ধ্বংসাত্মক কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। সহিহ বুখারির ২৮৬৪ নম্বর হাদিসে বর্ণিত সেই সাতটি কাজ হলো—

১. আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা।
২. জাদু করা।
৩. অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা।
৪. সুদ খাওয়া।
৫. এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা।
৬. যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করা।
৭. নিরপরাধ নারীর প্রতি অপবাদ দেওয়া।

ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী, জাদু ও শয়তানের অনিষ্ট থেকে বাঁচতে ইমান, পবিত্রতা, নিয়মিত ইবাদত এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

/এসএন