অজু করার পর বিড়ি বা সিগারেট পান করেন—এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়। এ নিয়ে অনেক মুসলমানের মনে প্রশ্ন রয়েছে, ধূমপান করলে অজু ভেঙে যায় কি না। সিগারেট খাওয়ার পর নতুন করে অজু করতে হবে, নাকি আগের অজু দিয়েই নামাজ আদায় করা যাবে—এ বিষয়টি নিয়ে রয়েছে নানা জিজ্ঞাসা।
ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, শুধু বিড়ি বা সিগারেট পান করার কারণে অজু নষ্ট হয় না। কেননা, ধূমপান অজু ভঙ্গের স্বীকৃত কারণগুলোর অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে অজু বহাল থাকার বিষয়টির পাশাপাশি ধূমপানের স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং এর ফলে সৃষ্ট দুর্গন্ধের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
ধূমপান করলে কি অজু ভেঙে যায়?
ইসলামি শরিয়তে অজু ভঙ্গের কিছু নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রস্রাব-পায়খানার রাস্তা দিয়ে কিছু নির্গত হওয়া, গভীর ঘুম, জ্ঞান হারানো এবং নেশাগ্রস্ত হওয়া। হানাফি ফিকহেও অজু ভঙ্গের আরও কয়েকটি কারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী অজু ভঙ্গের উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হলো—
১. প্রস্রাব-পায়খানার রাস্তা দিয়ে কোনো কিছু বের হওয়া।
২. শরীরের কোনো স্থান থেকে রক্ত বা পুঁজ বের হয়ে গড়িয়ে পড়া।
৩. মুখভর্তি বমি হওয়া।
৪. এমন গভীর ঘুম হওয়া, যাতে শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না।
৫. অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।
৬. পাগল বা মাতাল হওয়া।
৭. নামাজের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির উচ্চস্বরে হাসা।
তবে এসব বিধানের কিছু বিষয়ে বিভিন্ন মাজহাবের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। এ কারণে নির্দিষ্ট ফিকহি মত অনুসরণ করা প্রয়োজন।
বিড়ি বা সিগারেট পান করার ফলে অজু ভঙ্গের কোনো কারণ সৃষ্টি হয় না। তাই ধূমপান করলেও আগের অজু বহাল থাকে। এ বিষয়ে হানাফি ফিকহের ‘রদ্দুল মুহতার’ ও ‘ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি’সহ বিভিন্ন গ্রন্থে অজু ভঙ্গের যেসব কারণ উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে ধূমপানের কোনো সম্পর্ক নেই।
অজু না ভাঙলেও ধূমপান কেন ক্ষতিকর?
ধূমপানের কারণে অজু নষ্ট না হলেও এটি স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তামাকজাত পণ্যে থাকা নিকোটিন মানুষের মধ্যে আসক্তি তৈরি করে। দীর্ঘদিন ধূমপানের অভ্যাস থাকলে ক্যানসার, হৃদ্রোগ, স্ট্রোক এবং ফুসফুসের বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
ইসলামে নিজের জীবন ও শরীরের ক্ষতি করা এবং সম্পদের অপচয় থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন—
وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ
অর্থ: ‘তোমরা নিজেদের হাতে নিজেদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়ো না।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত ১৯৫)
এই আয়াতের আলোকে নিজের ক্ষতি হয়—এমন কাজ থেকে বিরত থাকার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
সিগারেটের দুর্গন্ধ নিয়ে নামাজ পড়া যাবে?
ধূমপানের পর মুখ ও শরীরে তীব্র দুর্গন্ধ তৈরি হতে পারে। এই গন্ধে আশপাশের মুসল্লিরা অস্বস্তিতে পড়তে পারেন। ইসলাম অন্যকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দিয়েছে।
এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের ওপর বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়।’ (সহিহ বুখারি)
নামাজ আদায়ের বিধান
শুধু ধূমপানের কারণে অজু ভেঙে যায় না। তাই ধূমপানের পর অন্য কোনো অজু ভঙ্গের কারণ না ঘটলে আগের অজু দিয়েই নামাজ আদায় করা যাবে। তবে মুখে দুর্গন্ধ থাকা অবস্থায় নামাজে দাঁড়ানো অনুচিত। নামাজের আগে মুখের দুর্গন্ধ দূর করে নেওয়া উচিত।
মসজিদে প্রবেশের ক্ষেত্রে সতর্কতা
রাসুলুল্লাহ (সা.) কাঁচা পেঁয়াজ ও রসুন খাওয়ার পর মুখে দুর্গন্ধ নিয়ে মসজিদে আসতে নিষেধ করেছেন। কারণ, এতে অন্য মুসল্লি ও ফেরেশতারা কষ্ট পান। ধূমপানের কারণে সৃষ্ট দুর্গন্ধও মসজিদে থাকা অন্যদের অস্বস্তির কারণ হতে পারে। তাই মুখের দুর্গন্ধ দূর না করে মসজিদে প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
ধূমপায়ীদের জন্য পরামর্শ
ধূমপানের অভ্যাস একদিনে ছেড়ে দেওয়া অনেকের জন্য কঠিন হতে পারে। তবে এই অভ্যাসের কারণে নামাজ কিংবা জামাত থেকে দূরে থাকা উচিত নয়। বরং ধূমপান ছেড়ে দেওয়ার জন্য নিয়মিত চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
নামাজ আদায় বা মসজিদে যাওয়ার আগে ভালোভাবে দাঁত ব্রাশ করা, মিসওয়াক করা এবং মুখ পরিষ্কার রাখা উচিত। তবে শুধু মুখের দুর্গন্ধ আড়াল করার চেষ্টা না করে ধূমপানের অভ্যাস সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়াই জরুরি।
মনে রাখতে হবে, ধূমপান অজু ভঙ্গ করে না। কিন্তু এটি স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে এবং এর দুর্গন্ধ অন্যের ইবাদতে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। তাই নিজের সুস্থতা, পরিচ্ছন্নতা এবং অন্যের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে ধূমপান বর্জন করাই উত্তম।
/এসএন