• ঢাকা
  • সোমবার, ০৩ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৬ এএম


‘এই ট্রেন মানবজীবনের মতো’—‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নিয়ে হাসনাতের বিশ্লেষণ

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২ জুন ২০২৬ ৫:২৭ পিএম

পরিচালক তানিম নূরের তারকাসমৃদ্ধ সিনেমা ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ঈদুল ফিতরে মুক্তির পর থেকেই দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রেক্ষাগৃহে সফল প্রদর্শনের পর ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পাওয়ার পর সিনেমাটি নিয়ে আগ্রহ ও আলোচনা আরও বেড়ে যায়। এবার সিনেমাটির প্রশংসাকারীদের তালিকায় যুক্ত হয়েছেন এনসিপি নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ।

সিনেমাটি দেখার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া তার একটি দীর্ঘ বিশ্লেষণধর্মী রিভিউ নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। শুধু সাধারণ দর্শকরাই নন, হাসনাতের লেখায় মুগ্ধ হয়েছেন সিনেমাটির নির্মাতা তানিম নূরও।

নিজের ফেসবুক ওয়ালে হাসনাত আবদুল্লাহর রিভিউটি শেয়ার করে নির্মাতা তানিম নূর তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি লিখেছেন, ‘বনলতা এক্সপ্রেসের এত চমৎকার প্রাণবন্ত রিভিউ লেখার জন্য হাসনাত আবদুল্লাহকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।’

পোস্টটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসায় ভাসছেন তানিম নূর ও হাসনাত আবদুল্লাহ দুজনেই। মন্তব্যকারীদের অনেকেই তানিম নূরকে বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা নির্মাতা হিসেবে উল্লেখ করে তার এমন কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।

অন্যদিকে হাসনাত আবদুল্লাহর লেখার গভীরতা, জীবনবোধ ও বিশ্লেষণধর্মী উপস্থাপনারও প্রশংসা করছেন নেটিজেনরা। অনেকের মতে, সিনেমাটি দেখার সময় সাধারণ দর্শকদের চোখ এড়িয়ে যাওয়া অনেক সূক্ষ্ম বিষয় তিনি তার রিভিউতে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে তার সাহিত্যিক ও লেখকসুলভ সত্তাও এই লেখার মাধ্যমে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

রিভিউতে হাসনাত আবদুল্লাহ লিখেছেন, অসুস্থ এক মায়ের জন্য হেলিকপ্টার চাওয়ার প্রসঙ্গে মন্ত্রী ও গণিতের অধ্যাপক রশিদ উদ্দিনের সংলাপ থেকেই সিনেমাটির মূল দর্শন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার ভাষায়, ‘মামুলি বিষয়কে বড় করে তোলাই তো মানুষের কাজ।’

তিনি মনে করেন, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ঠিক সেটিই করেছে। ছোট ছোট গল্পের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের জীবন, বেদনা ও সংগ্রামকে একসঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। তার মতে, সিনেমাটি দেখার পর বনলতা এক্সপ্রেসকে আর কেবল একটি ট্রেন মনে হয় না, বরং মনে হয় মানুষের দুঃখ-বেদনা বহনকারী এক জীবন্ত বাহন, যার প্রতিটি বগি ভিন্ন ভিন্ন গল্পে পূর্ণ।

রিভিউতে তিনি ডাক্তার আশহাব চরিত্রের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, হাসিখুশি ও ম্যাজিক দেখানো ছেলেটিও একসময় ভেঙে পড়ে বলে, “না পারলাম ভালো মানুষ হইতে, না পারলাম ভালো ডাক্তার হইতে…”। হাসনাতের মতে, এই চরিত্রটি বাংলাদেশের অসংখ্য বড় ছেলের প্রতিচ্ছবি, যাদের জীবনে শৈশবের ট্রমা, বর্তমানের আফসোস এবং মুখে লুকানো কৃত্রিম হাসি রয়েছে।

সিনেমার বিভিন্ন চরিত্রের দুঃখ, মৃত্যু, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ ও নতুন জীবনের সূচনাকে তিনি মানবজীবনের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। নিঃসন্তান অথচ ক্ষমতাবান মন্ত্রী আবুল খায়ের, একমাত্র সন্তানের কফিন নিয়ে যাত্রা করা রশিদ উদ্দিন, হাতে মাত্র এক বছরের জীবন নিয়ে বেঁচে থাকা আজিজ কিংবা নতুন স্বপ্ন নিয়ে পথচলা শুরু করা রুবি—সবাইকে তিনি জীবনের ভিন্ন ভিন্ন রূপ হিসেবে দেখেছেন।

হাসনাত লিখেছেন, একই ট্রেনে কেউ কফিন নিয়ে যাত্রা করছে, আবার কেউ নতুন জীবন শুরু করতে এগিয়ে যাচ্ছে। একদিকে বিদায়, অন্যদিকে আগমন—এই দুই প্রান্তকে একই রেখায় বেঁধেছে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’।

গণিতের অধ্যাপক চরিত্রের সংলাপ “হোল ওয়ার্ল্ডে আমি ম্যাথে জায়ান্ট নাম্বার এইট, কিন্তু ম্যাথ আমার হাতে নাই” উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, আসলে কি জীবনের হিসাব মানুষের হাতে থাকে, নাকি সব হিসাবের সমাধান অন্য কারও হাতে নির্ধারিত?

রিভিউতে তিনি আরও লিখেছেন, মানুষের জন্মের সময় কানে আজান দেওয়া হয়, আর মৃত্যুর পর হয় জানাজার নামাজ। এই দুইয়ের মধ্যবর্তী সময়টুকুই জীবন। তার মতে, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সেই জীবনেরই প্রতিচ্ছবি, যেখানে এক পাশে সন্তানের কফিন, অন্য পাশে নবজাতকের জন্ম; এক পাশে ক্ষমতার অহংকার, অন্য পাশে মানুষের প্রতি ভালোবাসা।

দিনশেষে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’কে নিজের গল্প, আমাদের সবার গল্প হিসেবে দেখেছেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তার ভাষায়, জীবন মানেই বারবার পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়ানো এবং সামনে এগিয়ে চলা। তিনি লিখেছেন, নিয়তির কারণেই থেঁতলে যাওয়া একটি ব্যাঙও শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লাফিয়ে চলার চেষ্টা করে। এই চলার মধ্যেই জীবনের ধর্ম নিহিত।

রিভিউয়ের শেষাংশে তিনি উল্লেখ করেন, ‘এই বনলতা এক্সপ্রেসকে কেউ থামাতে পারে না। কারণ এই ট্রেন মানবজীবনেরই মতো, যেখানে স্থবিরতা নয়, রূপান্তরই চূড়ান্ত সত্য। সেই রূপান্তরের ভেতর দিয়েই মানুষ অশ্রুকে অভিজ্ঞতায়, সংগ্রামকে সাফল্যে, দুঃখকে মহাকাব্যে এবং সম্ভাবনাকে ইতিহাসে পরিণত করে।’

নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ‘কিছুক্ষণ’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ পরিচালনা করেছেন তানিম নূর। মুক্তির পর থেকেই সিনেমাটি দেশের প্রেক্ষাগৃহে ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসা ও বাণিজ্যিক সাফল্য পায়।

সিনেমাটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন চঞ্চল চৌধুরী, মোশাররফ করিম, শরিফুল রাজ, সাবিলা নূর, আজমেরী হক, জাকিয়া বারী মম, শ্যামল মওলা এবং ইন্তেখাব দিনারের মতো জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পীরা। বুড়িগঙ্গা টকিজ, ডোপ প্রোডাকশন ও হইচই স্টুডিওসের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত এই সিনেমাটি বর্তমানে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হইচইয়ে দেখা যাচ্ছে।

/এসএন