• ঢাকা
  • সোমবার, ০৩ আগস্ট ২০২৬, ১১:৪৯ এএম


ঢাকা দক্ষিণ মেয়র পদে জামায়াতের পছন্দ সাদিক কায়েম, কী করবে এনসিপি?

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২৮ জুলাই ২০২৬ ১১:১৪ এএম

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র পদে ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েমকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তবে এর আগেই একই পদে নিজেদের দলীয় প্রার্থী হিসেবে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার নাম ঘোষণা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

দুই জোটসঙ্গী দলের একই পদে পৃথক প্রার্থী নির্ধারণের উদ্যোগ রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। কেউ এটিকে দুই দলের মধ্যে সমঝোতার অভাবের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ মনে করছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে আপাতত উভয় দলই নিজেদের সাংগঠনিক প্রস্তুতি অনুযায়ী প্রার্থী চূড়ান্ত করছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ও এনসিপি জোটবদ্ধ হয়ে অংশ নেয়। যদিও সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল এখনো ঘোষণা হয়নি, তবে বছরের শেষ দিকে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।

এনসিপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দলটি আপাতত স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে একক প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। নির্বাচনী জোট বা সমঝোতা নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চললেও ঢাকা দক্ষিণে জামায়াতের পক্ষ থেকে সাদিক কায়েমকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্তে আসিফ মাহমুদের সমর্থকদের মধ্যে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন আসিফ মাহমুদ। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের ছাত্র উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর সরকার থেকে পদত্যাগ করে তিনি এনসিপিতে যোগ দেন এবং বর্তমানে দলের মুখপাত্র ও নীতিনির্ধারকদের একজন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১০ আসন থেকে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত তিনি নির্বাচন করেননি।

এনসিপির এক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে জানান, সংসদ নির্বাচনের সময়ও আসিফ মাহমুদকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে জামায়াতের আপত্তি ছিল। তাঁর ভাষ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা থাকাকালে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের কারণ দেখিয়ে তখন তাঁকে সমর্থন দেয়নি জামায়াত। একই ধরনের পরিস্থিতি এবারও তৈরি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

অন্যদিকে এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের এক সদস্যের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারে দায়িত্ব পালনের সময় জামায়াতের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কয়েকটি বিষয়ে আসিফ মাহমুদের অবস্থান নিয়ে দলটির আপত্তি রয়েছে। তবে ঠিক কোন বিষয়গুলো নিয়ে আপত্তি, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত বলেননি।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে এনসিপি ইতোমধ্যে ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তরসহ পাঁচটি সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। গত ২৯ মার্চ ঘোষিত তালিকায় ঢাকা দক্ষিণে দলের প্রার্থী হিসেবে আসিফ মাহমুদের নাম রয়েছে। পাশাপাশি দেশের ১০০টি উপজেলা ও পৌরসভায়ও দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছে এনসিপি।

এদিকে রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের সঙ্গে আসিফ মাহমুদের সাম্প্রতিক বৈঠক। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, একসঙ্গে কাজ করার সম্ভাবনা নিয়ে তাঁদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।

মামুনুল হকের দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস বর্তমানে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের অংশ। একই সময়ে হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত কওমি ঘরানার সাতটি ইসলামী দলের বৈঠকেও তিনি অংশ নেন। ফলে তাঁর সঙ্গে আসিফ মাহমুদের বৈঠককে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

এনসিপির একজন দায়িত্বশীল নেতা জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এখনো কোনো জোট বা সমঝোতা চূড়ান্ত হয়নি। তবে ভবিষ্যতে নতুন কোনো সমঝোতা হলে ঢাকা দক্ষিণে আসিফ মাহমুদ এবং ঢাকা উত্তরে মামুনুল হককে ঘিরে রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হতে পারে। যদিও এ ধরনের কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা এখনো হয়নি।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে বা পরে জাতীয় পর্যায়ে প্রয়োজন হলে বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সমঝোতা হতে পারে। তবে বর্তমানে প্রতিটি দল নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি ও প্রার্থীদের অবস্থান শক্তিশালী করার দিকেই মনোযোগ দিচ্ছে।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি নির্বাচিত হন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা মো. আবু সাদিক, যিনি সাদিক কায়েম নামে পরিচিত। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় তিনি জামায়াতের প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেন। গত ২২ জুন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে তাঁকে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে দলীয় প্রার্থী হিসেবে প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়। পরে ১৩ জুলাই তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পাদকের পদ ছেড়ে দেন, যা নির্বাচনী প্রস্তুতির অংশ বলেই সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

জামায়াত সাদিক কায়েমকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত করায় ঢাকা দক্ষিণে আসিফ মাহমুদ দলটির সমর্থন পাবেন না—এমন ধারণা জোরালো হয়েছে। ফলে তিনি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেবেন কি না, নিলে কীভাবে অংশ নেবেন, নাকি এনসিপি তাঁকে কুমিল্লা বা অন্য কোনো সিটিতে প্রার্থী করবে—এসব প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় রয়েছে।

সম্প্রতি প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আসিফ মাহমুদ জানান, তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী। তাঁর বিশ্বাস, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা বা নির্বাচনী বোঝাপড়া তৈরি হবে।

জামায়াত জোটের বাইরে সমঝোতার সম্ভাবনা রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সব ধরনের সম্ভাবনাই রয়েছে।

মাওলানা মামুনুল হকের সঙ্গে নিজের সুসম্পর্কের কথাও উল্লেখ করেন আসিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, তাঁদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে কার সঙ্গে কী ধরনের সমঝোতা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তাঁর ধারণা, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সময় এগুলো পরিষ্কার হয়ে যাবে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত জোটের হয়ে ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এনসিপি ছয়টি আসনে জয় পায়। আসিফ মাহমুদের মতে, সীমিত সংখ্যক আসনে নির্বাচন করায় দলের তৃণমূল সংগঠন অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলটি এককভাবে অথবা সমঝোতার ভিত্তিতেও অন্তত ৭০ শতাংশ এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চায়।