• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫৯ এএম


অন্তর্বর্তী সরকারে সক্রিয় ছিল ৭ সদস্যের ‘কিচেন কেবিনেট’: আসিফ মাহমুদ

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২৬ মে ২০২৬ ৯:৩৮ পিএম

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারে ‘কিচেন কেবিনেট’ ছিল বলে মন্তব্য করেছেন সেই সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ওই ‘কিচেন কেবিনেটের’ সদস্য তিনি ছিলেন না।

আজ মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। ঝিনাইদহে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের হামলা এবং সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে এক সাংবাদিক জানতে চান, তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের ‘কিচেন কেবিনেটের’ সদস্য ছিলেন কি না। জবাবে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘কিচেন কেবিনেট ছিল। কিন্তু আমি সেটার সদস্য ছিলাম না।’

রাষ্ট্র বা সরকার পরিচালনায় ‘কিচেন কেবিনেট’ বলতে কোনো আনুষ্ঠানিক ফোরামকে বোঝায় না। সাধারণত রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত কিছু সহকর্মীর একটি অনানুষ্ঠানিক গোষ্ঠীকে বোঝাতে এ শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়, যাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সম্প্রতি সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের একটি সাক্ষাৎকারের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালনায় সাত সদস্যের একটি কিচেন কেবিনেট সক্রিয় ছিল এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সেখান থেকেই আসত। তিনি আরও বলেন, প্রতি মঙ্গলবার যমুনায়, অর্থাৎ সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনে, তাদের বৈঠক হতো। এই গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপ ও মন্ত্রণালয়ের কাজে প্রভাব বিস্তারের কারণে তিনি তিনবার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তবে সরকারের অস্বস্তির কথা ভেবে শেষ পর্যন্ত তা করেননি।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। ছাত্র-তরুণদের প্রতিনিধি হিসেবে সেই সরকারে উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। প্রথমে তিনি ক্রীড়া উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। পরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পান। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আরেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের সঙ্গে তিনিও অন্তর্বর্তী সরকার থেকে বিদায় নেন। পরে এনসিপির মুখপাত্রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে সই হওয়া বাণিজ্যচুক্তি নিয়েও কথা বলেন আসিফ মাহমুদ। তিনি দাবি করেন, ওই চুক্তির বিষয়ে এনসিপির মতামত নেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, এই চুক্তিটা বিএনপিই করেছে। কিন্তু সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে তাদেরই বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে দিয়ে তারা এটা অন্তর্বর্তী সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে। এখন একটা পলিটিক্যাল ব্লেম গেম চলছে।’

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিপুল জয় পায়। নির্বাচনের তিন দিন আগে, অর্থাৎ ৯ ফেব্রুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি সই করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। ওই চুক্তির পেছনে সে সময়ের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও বর্তমান বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা হয়।

খলিলুর রহমান গত ৪ মার্চ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি নির্বাচনের আগেই দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তারা এতে সম্মতি দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘এমন নয় যে এটা আমরা অন্ধকারে করেছি।’

তবে ওই বক্তব্যের পর ৬ মার্চ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান এক ফেসবুক পোস্টে দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যেসব চুক্তি হয়েছে, সেগুলোর কোনোটি নিয়েই তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি।

পরে ১৫ মে রংপুরের এক অনুষ্ঠানে শফিকুর রহমান আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যচুক্তির বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের কেউ জামায়াতের সঙ্গে আলোচনা করেনি।

এ বিষয়ে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি হয়, তখন আমি এনসিপির মুখপাত্র ছিলাম। ফলে চুক্তি সম্পর্কে আমার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কিছু জানা সম্ভব নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনেকেই বলেন, বাণিজ্যচুক্তি সম্পর্কে সব দলকেই জানানো হয়েছে। আমি আমার দলের আহ্বায়কসহ সবার সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছি, চুক্তির বিষয়ে কেউ এনসিপির কনসার্ন নেয়নি। এটা আমি পরিষ্কারভাবে জানাচ্ছি।’

সরকারের উদ্দেশে এনসিপির মুখপাত্র বলেন, ‘চুক্তিটি করেছেন বর্তমান বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। যদি অন্য কিছু হয়, তাহলে আপনারা এ চুক্তিটা পর্যালোচনা করুন, বাতিল করুন। চুক্তির যে অংশগুলো বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, সেগুলো নিয়ে দেশের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় আলোচনা চালান।’

তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা বারবার অন্তর্বর্তী সরকার, এনসিপি, জামায়াত—এদের ওপর দায় দিতে চান। কিন্তু চুক্তি করেছে আপনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এই ব্লেম গেমের রাজনীতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে।’

ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বসা কোরবানির পশুর হাটের ইজারা নিয়েও মন্তব্য করেন আসিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, এবারের ঈদে দেশের প্রায় সব পশুর হাটের ইজারা বিএনপির লোকজন পেয়েছেন। যারা হাটের ইজারা পাননি, তারাও বিভিন্ন এলাকায় পাড়ায় পাড়ায় হাট বসিয়ে হাসিল আদায় করছেন।

মেট্রোরেল স্টেশনের নিচেও হাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, পুরো ব্যবস্থাটি বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে।

ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও নানা অব্যবস্থাপনার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এনসিপির মুখপাত্র।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে পরিবারতন্ত্রের প্রভাবের সমালোচনা করে সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘মনে হচ্ছে, আমরা একটা রাজতন্ত্রে বসবাস করছি। অথচ এর আগে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মুখে শোনা গিয়েছিল, তাঁরা ক্রীড়াক্ষেত্রকে দলীয়করণ করবেন না। তাঁরা আসলে সত্যি কথাই বলেছিলেন। তাঁরা দলীয়করণ নয়, পরিবারকরণ করেছেন। এখন সবাই ভয়ে চুপ করে আছে।’

সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। এ সময় দলের যুগ্ম সদস্যসচিব আলাউদ্দীন মোহাম্মদ, এস এম সাইফ মোস্তাফিজসহ অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।