• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০২:০০ এএম


গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে চু’রি যাওয়া দুই লেমুর ভারতে কীভাবে গেল

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২:২৮ পিএম

রাজধানী ঢাকার অদূরে গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে প্রায় দেড় বছর আগে চুরি যাওয়া ‘রিঙ-টেইলড’ বা ডোরাকাটা লেজের দুই লেমুর ভারতে পাচার হয়ে গেছে বলে জানতে পেরেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

সিআইডির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একাধিক হাতবদলের পর বিপন্ন প্রজাতির ওই দুই লেমুর ভারতের গুজরাতের একটি বেসরকারি বন্যপ্রাণী উদ্ধার, সংরক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে গিয়ে পৌঁছেছে।

লেমুর দুটিকে সেখান থেকে উদ্ধার করে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে পুলিশের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে গাজীপুর সাফারি পার্ক কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় সব তথ্য-প্রমাণ দিতে না পারায় লেমুর দুটির দেশে ফেরত আসা নিয়ে এখন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

চুরি যাওয়া লেমুর ফেরত পেতে হলে প্রথমে প্রমাণ করতে হবে, ভারতে থাকা প্রাণী দুটিই বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিকভাবে কার্যকর একটি উপায় হতে পারে ডিএনএ পরীক্ষা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ড. মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘এটা করার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানসম্মত ও কার্যকর একটি উপায় হলো, প্রাণিটির আগের জেনেটিক প্রোফাইল বা ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টের সঙ্গে নতুন টেস্টের রিপোর্ট মিলিয়ে দেখা।’

তবে গাজীপুর সাফারি পার্কের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চুরি হয়ে যাওয়া ওই দুই লেমুরের কোনো ডিএনএ রিপোর্ট তাদের কাছে নেই।

সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘তবে আরেকটি লেমুরের ডিএনএ স্যাম্পল কালেক্ট করে আমরা পরীক্ষা করতে পাঠিয়েছি, যার সঙ্গে ওই দুই লেমুরের রক্তের সম্পর্ক রয়েছে। সেটা একটা আশার জায়গা।’

‘রিঙ-টেইলড’ বা ডোরাকাটা লেজের লেমুর বাংলাদেশের স্থানীয় কোনো প্রাণী নয়। এদের মূল আবাস আফ্রিকা মহাদেশের মাদাগাস্কার দ্বীপ। সেখান থেকে চোরাকারবারিরা এসব প্রাণী ধরে বিভিন্ন দেশে পাচার করে থাকে, যা প্রাণীটির অস্তিত্বকে মারাত্মকভাবে বিপন্ন করে তুলেছে।

২০১৮ সালে বিদেশি পশু-পাখির এমনই একটি অবৈধ চালান ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ধরা পড়ে। সে সময় ম্যাকাও, ময়ূরসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির সঙ্গে এক জোড়া ডোরাকাটা লেজের লেমুরও উদ্ধার করা হয়। পরে ওই লেমুর জোড়াকে গাজীপুর সাফারি পার্কে পাঠানো হয়।

পরবর্তীতে ওই লেমুর জোড়া আরও দুটি বাচ্চা জন্ম দেয়। বেশ কিছুদিন একসঙ্গে থাকার পর ২০২২ সালের শুরুতে হঠাৎ একটি লেমুর মারা যায়। এর প্রায় তিন বছর পর, ২০২৫ সালের মার্চে অবশিষ্ট তিনটি লেমুর একসঙ্গে চুরি হয়ে যায়।

গাজীপুর সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক রহমান বলেন, ‘বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কিছু কর্মী তখন এখানে কাজ করত। তাদেরই একজনের সহযোগিতায় একটি চক্র এই চুরির ঘটনা ঘটিয়েছিল।’

পরে ওই কর্মীসহ চক্রটির আট সদস্যের মধ্যে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। চুরির প্রায় এক মাসের মধ্যে ঢাকার একটি বাসা থেকে তিনটি লেমুরের একটিকে উদ্ধার করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিআইডির একজন কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তারা স্বীকার করে যে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বাকি দু’টি লেমুর ভারতে পাচার করে দিয়েছে। চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে সেগুলো ভারতে ঢুকেছে।’

উদ্ধার করা একমাত্র লেমুরটিকে পরে গাজীপুরের সাফারি পার্কে ফিরিয়ে আনা হয়। তবে সেটিও পরবর্তী সময়ে মারা গেছে।

সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক রহমান বলেন, ‘কয়েক মাস আগে সেটিও হঠাৎ মারা গেছে।’

লেমুরটি কী কারণে মারা গেল—এমন প্রশ্নের জবাবে রহমান বলেন, ‘লেমুর সাধারণত একা থাকে না, দল বেঁধে থাকে। দীর্ঘদিন নিঃসঙ্গ থাকার কারণে শেষ লেমুরটি মারা গেছে বলে আমরা ধারণা করছি।’

সিআইডি জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়ার পর থেকেই পাচারের শিকার ডোরাকাটা লেজের দুই লেমুরের বিষয়ে অনুসন্ধান চালানো হচ্ছিল।

একপর্যায়ে কর্মকর্তারা জানতে পারেন, একাধিক হাত ঘুরে লেমুর দুটি ভারতের গুজরাতের একটি বেসরকারি বন্যপ্রাণী উদ্ধার, সংরক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে পৌঁছেছে।

সিআইডির একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘কেন্দ্রটির নাম ভান্তারা, যার মালিকানায় রয়েছে ভারতের অন্যতম শীর্ষ ব্যবসায়ী আম্বানি পরিবার।’

তথ্যটি নিশ্চিত করতে সিআইডি কর্মকর্তারা লেমুর দুটির ছবি ও ভিডিও সংগ্রহের চেষ্টা করছিলেন। এর মধ্যেই তারা দেখতে পান, ভান্তারা ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই লেমুরগুলোর ভিডিও প্রকাশ করেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিআইডির ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এর মধ্যেই একদিন দেখা গেল, ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যমে ভান্তারা সেগুলোর ভিডিও আপলোড করেছে।’

ভান্তারা নামে একটি ফেসবুক পেজে, যার প্রায় ১০ লাখ ফলোয়ার রয়েছে, কয়েক মাস আগে ডোরাকাটা লেজের লেমুরের একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। ভিডিওতে বেশ কয়েকটি লেমুরকে একসঙ্গে দেখা যায়।

সিআইডি কর্মকর্তারা কীভাবে নিশ্চিত হলেন যে ভিডিওতে থাকা লেমুরগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া লেমুরও রয়েছে—এ বিষয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘ভিডিওটা পাওয়ার পর সেটা আমরা সাফারি পার্কের কর্মকর্তাদেরও দেখাই। যেহেতু তারা যেহেতু অনেক থেকে কাছ থেকে দেখেছে। পরে তারাই মোটামুটিভাবে নিশ্চিত করে যে, আমাদের লেমুর দুটিও সেখানে রয়েছে।’

এরপর লেমুর দুটিকে দেশে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ পুলিশ ইন্টারপোলের সহযোগিতা চায়। তবে দাবির পক্ষে তথ্য-প্রমাণ চেয়ে পাঠানোর পর দেখা যায়, গাজীপুর সাফারি পার্ক কর্তৃপক্ষের কাছে কিছু ছবি ও ভিডিও ছাড়া শক্ত কোনো প্রমাণ নেই।

সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক রহমান বলেন, ‘আসলে আগে যেহেতু এ ধরনের পাচারের ঘটনা ওইভাবে ঘটেনি, সেজন্য লেমুরগুলোর জেনেটিক প্রোফাইল বা ডিএনএ পরীক্ষার বিষয়টিও আমার মাথায় ছিল না। তাছাড়া এগুলো করার সক্ষমতাও আমাদের এখনও নেই।’

তবে তখন জীবিত থাকা লেমুরটির নমুনা সংগ্রহ করে একটি জেনেটিক প্রোফাইল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এ বিষয়ে সিআইডির ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এটার রিপোর্ট পাওয়া গেলে ইন্টারপোলের মাধ্যমে সেটার সঙ্গে ভারতেরগুলোর জেনেটিক প্রোফাইল মিলিয়ে দেখা হবে। যেহেতু তারা একই পরিবারের, সেজন্য মিল পাওয়া যাবে বলে আশা করি।’

এদিকে, লেমুর পাচারের অভিযোগের বিষয়ে ভান্তারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিবিসির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

/এসএন