• ঢাকা
  • সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:১৪ পিএম


চার মাস পার হয়ে গেলো—বিচার তো দূরের কথা, মা-বোনদের হত্যার কারণই জানতে পারলাম নাঃ সিফাত

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২ নভেম্বর ২০২৬ ৫:১৪ পিএম


‘বিচার তো অনেক দূরের কথা, চার মাস পেরিয়ে গেলেও আমার মা ও তিন বোনকে কেন হত্যা করা হলো, সেই কারণটুকুও জানতে পারলাম না।’ কথাগুলো বলতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন জুনায়েদ ইসলাম ওরফে সিফাত (১৮)। লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মা ও তিন বোনকে হারিয়ে এখন একাই দিন কাটছে তার।

গত ২৫ জুন রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা এলাকার একটি ভাড়া বাসায় নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন সিফাতের মা শাহিনুর বেগম (৪০) এবং তিন বোন সাইমা আক্তার (২১), নাফিসা আক্তার ওরফে ইকরা (১৭) ও ফাতেমা আক্তার ওরফে সিফা (১০)। ওই পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য এখন সিফাত।

স্বজনদের হারানোর পর থেকে পাশের একটি বাসায় বসবাস করছেন তিনি। জীবিকা নির্বাহের জন্য স্থানীয় একটি রড-সিমেন্টের দোকানে কাজ শুরু করেছেন। দিনের অধিকাংশ সময় দোকানে কাটলেও রাতে বাসায় ফিরলেই তাকে ঘিরে ধরে পুরোনো স্মৃতি। মা ও বোনদের সঙ্গে কাটানো সময়ের কথা মনে পড়ে যায় বারবার।

সিফাত জানান, দিনের বেলায় কাজের ব্যস্ততায় কিছুটা সময় কেটে যায়। কিন্তু রাতে ঘরে ফিরলে স্বজনদের অনুপস্থিতি আরও বেশি অনুভব করেন। ঘুমাতে গেলেও চোখের সামনে ভেসে ওঠে মা ও বোনদের মুখ। তারা আর কখনো ফিরে আসবেন না—এই বাস্তবতা মেনে নিতে পারছেন না তিনি।

স্বজন হারানোর শোকের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ জানতে না পারার হতাশাও তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সিফাত চান, ঘটনার সব দিক ভালোভাবে তদন্ত করে প্রকৃত রহস্য উন্মোচন করা হোক। তার মনে প্রশ্ন, অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার একাই চারজনকে হত্যা করেছিলেন, নাকি এ ঘটনার পেছনে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

ঘটনার দিন ওই বাসায় ঢুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে চারজনকে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর পালানোর সময় স্থানীয় লোকজন অন্তর মজুমদার (২৮) নামের এক যুবককে আটক করে গণপিটুনি দেন। পরে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। অন্তরের বাড়ি নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায়।

ঘটনার পরদিন ধানহাটা এলাকায় জানাজা শেষে নিহত চারজনের মরদেহ কুমিল্লার হোমনায় তাঁদের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় জুনায়েদ ইসলাম রায়পুর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। অন্যদিকে, গণপিটুনিতে অন্তর মজুমদারের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে পৃথক আরেকটি হত্যা মামলা করে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্রেমঘটিত বিরোধ, অর্থ লেনদেন, স্বর্ণালংকার লুট কিংবা ব্যক্তিগত শত্রুতার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে তদন্তে এখন পর্যন্ত এসব সম্ভাবনার কোনোটিই নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ঘটনাস্থলের বাসায় তল্লাশি চালিয়ে কিছু স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়। এ কারণে কেবল লুটপাটের উদ্দেশ্যে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছে না পুলিশ। তবে পরিবারের ব্যবহৃত দুটি মুঠোফোন বাসায় পাওয়া যায়নি। পরে অন্তরকে গণপিটুনি দেওয়ার স্থান থেকে ফোন দুটি উদ্ধার করা হয়। সেগুলো অন্তর বাসা থেকে নিয়ে গিয়েছিলেন কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অন্তর মজুমদারের আগে নিয়মিত মুঠোফোনে যোগাযোগ ছিল কি না, তা যাচাই করা হয়েছে। তবে তাঁদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

দুটি মামলার তদন্ত করছেন রায়পুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুল মান্নান। তিনি বলেন, মামলাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। সাক্ষ্যপ্রমাণ, ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামত, ফরেনসিক প্রতিবেদন এবং প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিটি বিষয় সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা হচ্ছে। ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্‌ঘাটনে পুলিশ কাজ করছে।

/এসএন