• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৩৩ পিএম


দল-সরকারের কাউকেই বিশ্বাস করতেন না হাসিনা, ফোনকল রেকর্ড করাতেন: প্রসিকিউশন

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১০ আগস্ট ২০২৬ ৬:৫৫ পিএম

দল বা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি কিংবা পদধারীদের কাউকেই বিশ্বাস করতেন না ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ কারণে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির ফোনকল রেকর্ড করাতেন তিনি। কে কী বলছেন, তা নিজেই মনিটরিং ও নজরদারি করতেন বলে দাবি করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন।

রোববার (৯ আগস্ট) বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ একটি মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় বিষয়টি তুলে ধরেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ শীর্ষ সাত নেতার বিরুদ্ধে তৃতীয় দিনের মতো রোববার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করে প্রসিকিউশন।

এ সময় জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে কোথায় কী ধরনের বৈঠক ও যোগাযোগ হয়েছিল, তার বিভিন্ন দিক ট্রাইব্যুনালের সামনে তুলে ধরেন গাজী এমএইচ তামিম। একইসঙ্গে ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এবং যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশের পৃথক দুটি ফোনালাপ ট্রাইব্যুনালে বাজিয়ে শোনানো হয়।

এর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের বেশ কয়েকটি কথোপকথনের উদ্ধৃতিও উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর তামিম।

পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় গাজী এমএইচ তামিম জানান, ট্রাইব্যুনালে মোট ১৪টি কথোপকথন উপস্থাপন করা হয়েছে। শুরুতেই ওবায়দুল কাদের ও জুনাইদ আহমেদ পলকের একটি কথোপকথন শোনানো হয়, যেটি এরই মধ্যে ট্রাইব্যুনালে দালিলিক প্রমাণ হিসেবে গৃহীত হয়েছে।

তিনি বলেন, ওই কথোপকথন থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই ইন্টারনেট সেবা সীমিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন ওবায়দুল কাদের। পরে শেখ হাসিনার অনুমোদন নিয়ে সেটি কার্যকর করেন পলক।

প্রসিকিউটর তামিম বলেন, বিষয়টি কেবল কথোপকথনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৬ জুলাই সন্ধ্যা ৬টা থেকে দেশের ৫৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে থ্রি-জি ও ফোর-জি নেটওয়ার্ক বন্ধের নির্দেশনা জারি করেছিল সরকার। আন্দোলনের সময় ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টিকটকসহ কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও বন্ধ করে দেওয়া হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ‘সিস্টেম ক্রাইম’-এর একটি অংশ। এ ছাড়া জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সময়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাওয়া আহত আন্দোলনকারীদেরও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

গাজী এমএইচ তামিম আরও বলেন, ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে চট্টগ্রামের তৎকালীন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের কথোপকথনের পরপরই ১৬ জুলাই ওয়াসিমসহ তিনজনকে আওয়ামী লীগের নেতারা গুলি করে হত্যা করেন।

এ ছাড়া ওবায়দুল কাদের ও তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথনেও আন্দোলনকারীদের বিভিন্নভাবে চিহ্নিত করার বিষয় উঠে আসে বলে জানান তিনি। এসব কথোপকথনে আন্দোলনকারীদের সন্ত্রাসী, জঙ্গি, বিএনপি-জামায়াত ও রিলিজিয়াস অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে আখ্যায়িত করার বিষয়টি উঠে এসেছে। হাছান মাহমুদ বলেছিলেন, আন্তর্জাতিকভাবে ‘জঙ্গি’ শব্দটি গুরুত্ব পায়। তাই এ শব্দ ব্যবহার করা হলে আন্তর্জাতিক বিশ্ব তাদের পক্ষে কথা বলবে।

এ সময় শেখ হাসিনার একটি কথোপকথনের উদ্ধৃতিও তুলে ধরেন প্রসিকিউটর তামিম। সেখানে বলা হয়, ‘ওরা তো আমাদের অনেক কিছু পোড়াইছে। ওদের বাড়িঘর সব পোড়ায় দে। ওদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে না? সেগুলো পোড়ায় দে। এখন শুধু একটাই কাজ, সময়মতো বসে থাকবা, আর ওদের ঘরবাড়িতে আগুন দিবা।’

প্রসিকিউটর জানান, উপস্থাপন করা ১৪টি কথোপকথনই সিআইডির ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে।

এনটিএমসির মাধ্যমে ফোনকল রেকর্ডের বিষয়েও বিস্তারিত তুলে ধরেন গাজী এমএইচ তামিম। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার সময়ে চালু করা বিভিন্ন ব্যবস্থার মধ্যে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) একটি। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ছিলেন মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান।

প্রসিকিউটর তামিমের ভাষ্য, শেখ হাসিনা তার মাধ্যমে ফোনকল রেকর্ড করাতেন। তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা নিশ্চয়ই নিজের ফোনকল এনটিএমসিতে দেননি। কিন্তু আমরা অসংখ্য ফোনকল পেয়েছি এ সংস্থার মাধ্যমে। শেখ হাসিনা ঠিক যার সঙ্গে কথা বলছেন, তার ফোন নম্বরটি এনটিএমসিতে ছিল। এ কারণে ওই ব্যক্তির সঙ্গে যে-ই কথা বলতেন, সেটি রেকর্ড হয়ে যেতো। একইভাবে শেখ হাসিনাও যখন এসব ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছেন, তখন তার ফোনকলও রেকর্ড হয়েছে।’

/এসএন