যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গানভর ইউএসএ এলএলসি থেকে ১৩ বছর ধরে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করবে বাংলাদেশ। সরকার থেকে সরকার পর্যায়ের (জিটুজি) ভিত্তিতে মোট ৭৮ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা করা হয়েছে। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী এসব এলএনজির মূল্য প্রায় ৭১ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিবছর গানভর ইউএসএ এলএলসি থেকে ছয় কার্গো করে এলএনজি আমদানি করা হবে। চলতি ২০২৬ সাল থেকে শুরু করে ২০৩৯ সাল পর্যন্ত এ আমদানির কথা রয়েছে।
মঙ্গলবার ঢাকার সচিবালয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব নীতিগতভাবে অনুমোদন করা হয়। বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী কোনো ব্রিফ করেননি। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে অনুমোদনের বিষয়টি সাংবাদিকদের জানানো হয়। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের আওতাধীন সংস্থা পেট্রোবাংলা এ কেনাকাটার বাস্তবায়নকারী সংস্থা।
নীতিগত অনুমোদনের জন্য বৈঠকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ যে প্রস্তাব উপস্থাপন করে, তাতে বলা হয়, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, কাতার, ওমান ও সৌদি আরবের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পেট্রোবাংলার সাতটি চুক্তি রয়েছে। এসব স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে।
প্রস্তাবে বলা হয়, দেশে বিদ্যমান ও ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা মেটাতে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ জন্য আরও এলএনজি আমদানির প্রয়োজন রয়েছে। সেই কারণেই গানভর ইউএসএ এলএলসি থেকে জিটুজি ভিত্তিতে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে গানভর ইউএসএ এলএলসি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এ ক্ষেত্রে জিটুজি পদ্ধতির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাধারণত জিটুজি বলতে সরকার থেকে সরকার পর্যায়ের চুক্তিকে বোঝানো হয়। কোনো বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে সরকারের জিটুজি করার সুযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানই বেসরকারি, আর গানভর ইউএসএ এলএলসিও একটি বেসরকারি কোম্পানি।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু প্রথম আলোকে বলেন, ‘গানভরকে প্রথমে ১৩ বছর দেওয়া না-ও হতে পারে। দুই মাস পর সেপ্টেম্বর থেকে গানভরের এলএনজির জাহাজ আসবে। আমরা আগে তাদের পারফরম্যান্স দেখব। এরপর ঠিক করব ১৩ বছরের জন্য এটা করা যেতে পারে কি না।’
জ্বালানিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বাণিজ্যচুক্তি হয়েছে, তার ভিত্তিতেই এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে এবং গণখাতে ক্রয়বিধি (পিপিআর) অনুসরণ করেই করা হচ্ছে। পিপিআর ব্যাহত হলে এটা আমরা করতে যেতাম না।’
এক কার্গোতে ৩৩ লাখ ৬০ হাজার এমএমবিটিইউ (মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট) সমপরিমাণ এলএনজি থাকে। এর পরিমাণ প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাসের সমান।
বর্তমানে বিশ্ববাজারে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ২১ দশমিক ৫ থেকে ২২ মার্কিন ডলার। প্রতি এমএমবিটিইউ ২১ ডলার ধরে এক কার্গোর দাম পড়ে ৭ কোটি ৩৯২ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৯১৬ কোটি ৬১ লাখ টাকা। বছর ঘুরলে এলএনজির দাম বাড়ে। বর্তমান দর বিবেচনায় ৭৮ কার্গো এলএনজির মোট মূল্য দাঁড়ায় ৭১ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। এ হিসাব করা হয়েছে প্রতি ডলার ১২৪ টাকা ধরে।
সরকারি ক্রয়ে পিপিআর অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা বৈঠকে উপস্থিত থেকে যাচাই করে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ)। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিপিএর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আবু সাইদ মো. কামরুজ্জামান মঙ্গলবার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ওই দিনই এ পদে যোগ দিয়েছেন। তাই এ বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারছেন না।
তবে বিপিপিএর সাবেক সিইও ও তৎকালীন মহাপরিচালক ফারুক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি কোম্পানি গানভর ইউএসএ এলএলসির সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের জিটুজি কীভাবে হবে, তা স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্র সরকার যদি গানভরকে ঠিক করে দিয়ে থাকে বা মনোনয়ন দেয়, তাহলে সেটা একটা ব্যাপার। এ ক্ষেত্রে তা হয়েছে কি না, আমার জানা নেই। যদি না হয়ে থাকে, তাহলে জিটুজির ধরনটা গ্রহণযোগ্য হবে না এবং ভবিষ্যতে এ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।’
ফারুক হোসেন আরও বলেন, সরকার, সরকারের অধীন বা মনোনীত প্রতিষ্ঠান হতে হবে—যা পিপিআর ২০২৫-এ বলা হয়েছে। তাহলেই জিটুজি করা যাবে। এ ক্ষেত্রে সেই শর্ত নিশ্চিত হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।