রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনার এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই দিনের ভয়াবহ স্মৃতি এখনো তাড়া করে বেড়াচ্ছে বেঁচে যাওয়া শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের। কেউ হারানো বন্ধুর স্মৃতি আঁকড়ে আছেন, কেউ এখনো শরীরে বহন করছেন দুর্ঘটনার ক্ষতচিহ্ন। আবার অনেকের কাছে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া বিমানের শব্দ আজও সেই বিভীষিকাময় বিকেলের কথা মনে করিয়ে দেয়।
সরেজমিনে স্কুল প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবে ক্লাস ও খেলাধুলায় অংশ নিচ্ছে। তবে মাঝেমধ্যেই আকাশে বিমান উড়ে গেলে অনেকের মন ফিরে যায় এক বছর আগের সেই ঘটনায়।
অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী নিলয় আল নাফি জানান, দুর্ঘটনার সময় তার ছোট বোন ওই ভবনের ভেতরে ছিল, যেখানে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছিল। বিস্ফোরণের শব্দ শোনার পর তিনি ও তার মা দৌড়ে স্কুলে যান। দীর্ঘ সময় খোঁজাখুঁজির পর প্রায় এক ঘণ্টা পরে তার বোনকে খুঁজে পান। ঘটনার পর প্রায় এক মাস তার বোন মানসিকভাবে আতঙ্কে ছিল এবং মাকে ছাড়া ঘুমাতে পারত না। বর্তমানে সে অনেকটাই সুস্থ।
দুর্ঘটনায় আহত হওয়া বর্তমান পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী রুবাইদা নূর আলভীরা জানান, তিনি দীর্ঘ দুই মাস সাত দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এখন নিয়মিত স্কুলে এলেও শরীর ও মুখে সেই দুর্ঘটনার ক্ষতচিহ্ন রয়ে গেছে। তিনি বলেন, শুরুতে ভয় ও ট্রমা থাকলেও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন। তবে নিহত সহপাঠীদের কথা এখনো তার মনে পড়ে।
একই দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া আরেক শিক্ষার্থী আশরিফা জান্নাত রাইসা বলেন, ঘটনার সময় তিনি ভবনের নিচতলায় ছিলেন। বিকট শব্দের পর পুরো ভবন কেঁপে ওঠে এবং চারদিকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। তার সঙ্গে থাকা এক সহপাঠীকে তখন আর খুঁজে পাননি। বাইরে বেরিয়ে কয়েকজনের মরদেহ দেখতে পান, যা আজও তার মনে গভীর দাগ কেটে আছে। দুর্ঘটনায় তার দুই হাত পুড়ে যায় এবং এখনো চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বিশেষ গ্লাভস ব্যবহার করতে হয়।
দুর্ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে স্কুল কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির বাংলা মাধ্যমের কো-অর্ডিনেটর আজমেরি বেগম জানান, শিক্ষার্থীদের ভয় ও ট্রমা কাটাতে নিয়মিত ব্যক্তিগত ও দলভিত্তিক কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগেও চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। প্রায় দুই মাস ধরে ধারাবাহিকভাবে এসব কাউন্সেলিং কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ২১ জুলাই উত্তরার দিয়াবাড়িতে অবস্থিত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হলে ৩৬ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ২৮ জন ছিলেন শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় যুদ্ধবিমানটির পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামও প্রাণ হারান।
/এএসএফ