• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:২৫ এএম


প্রতি বর্ষায় তিস্তা ব্যারাজের গেট কেন খুলে দেয় ভারত?

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২৫ জুন ২০২৬ ৯:৪০ এএম

উজান থেকে নেমে আসা পানির প্রবল চাপ সামাল দিতে বাংলাদেশে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি গেটই খুলে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে তিস্তাসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ তথ্য জানিয়েছে বিবিসি বাংলা।

প্রতি বছরের বর্ষা মৌসুমে ভারতের অংশে তিস্তা নদীর ওপর নির্মিত বাঁধের গেট খুলে দেওয়া হলে বাংলাদেশকেও তিস্তা ব্যারাজের গেট খুলতে হয়। এর ফলে নদ-নদীর পানি হঠাৎ বেড়ে গিয়ে দেশের উত্তরাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।

এবারও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ব্যারাজের ৪৪টি গেট খুলে দেওয়ার পর নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, তিস্তার পানি কয়েকটি পয়েন্টে বিপৎসীমার কয়েক সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

বুধবার (২৪ জুন) দুপুর পর্যন্ত উপকূলীয় এলাকায় পানি প্রবেশ না করলেও সম্ভাব্য বন্যার কথা বিবেচনায় রেখে তিস্তা ব্যারাজসংলগ্ন নিচু এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী রেজাউল করিম মানিক বলেন, “পানি যেভাবে বাড়ছে তাতে উত্তরের নদীতীরবর্তী বিভিন্ন জেলার নিচু এলাকাগুলোতে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তিস্তার ৪৪টি গেটই খোলা রয়েছে।”

প্রতি বছর জুন-জুলাই মাসে বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা বন্যার ঝুঁকিতে পড়ে। এর প্রধান কারণ হিসেবে অতিবৃষ্টি এবং উজান থেকে হঠাৎ নেমে আসা পানির ঢলকে দায়ী করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বৃষ্টিপাত দীর্ঘস্থায়ী বন্যার জন্য যথেষ্ট নয়। তবে ভারতের সঙ্গে থাকা আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর উজানে নির্মিত বাঁধ থেকে পানি ছেড়ে দেওয়ার কারণে প্রতিবছর আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশের নদীগুলোর নাব্যতা কমে যাওয়া, নদী দখল এবং নিয়মিত ড্রেজিং না হওয়াও বন্যার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

নদী গবেষক ড. মোহাম্মদ মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি ব্যবস্থাপনা, পানি বণ্টন, বন্যার পূর্বাভাস এবং তথ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে যৌথ নদী কমিশনের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। তিনি বলেন, “একটা যৌথ নদী কমিশন আছে শুনি, কিন্তু তার কোনো কার্যক্রম তো দেখি না। নেপাল, ভারত, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশ এই চারটা দেশের মধ্যে নদী ইস্যুতে একটা সমঝোতা থাকতে হবে।”

অন্যদিকে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ জানিয়েছেন, বন্যার পূর্বাভাস ও নদীসংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান বাড়াতে ভারতের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তার ভাষ্য, “তারা (ভারত) আমাদের আশ্বস্ত করেছে যে, পানি ছেড়ে দিয়ে আমাদের এলাকাকে তারা বন্যায় প্রভাবিত করবে না। আমাদের যৌথ নদী কমিশনের টিম ও মন্ত্রণালয়ও তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে।”

এবার বন্যার শঙ্কা কতটা?

বাংলাদেশে সাধারণত জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমে বন্যার প্রকোপ সবচেয়ে বেশি থাকে। মৌসুমি বায়ু, অতিবৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের প্রধান নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি পায়।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইতোমধ্যে মৌসুমি বায়ুর প্রভাব শুরু হয়েছে। এর ফলে উত্তরাঞ্চল, ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চলে বৃষ্টিপাত বেড়েছে। আবহাওয়াবিদ মো. তরিফুল নেওয়াজ কবির জানান, চলতি মাসের ২৮ তারিখ থেকে বৃষ্টির প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। তবে তিনি মনে করেন, দেশের অভ্যন্তরীণ বৃষ্টিপাতের কারণে দীর্ঘস্থায়ী বন্যার আশঙ্কা তুলনামূলক কম।

তিনি বলেন, “আমাদের দেশের যে বন্যাগুলো হয় সেটি মূলত আপার স্ট্রিম অর্থাৎ উপরের দিকে ভারতের যে রাজ্যগুলো আছে সেখানকার পানির প্রভাবে। আমাদের ভূখণ্ডের বৃষ্টি থেকে যদি হয়, সেটিতে খুব দ্রুতই পানি নেমে যায়।”

বাংলাদেশের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান বলেন, বর্তমানে অধিকাংশ নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে থাকলেও তিস্তা, সুরমা, কুশিয়ারা ও সোমেশ্বরী নদীর পানি সতর্কসীমার কাছাকাছি রয়েছে।

তিনি জানান, আগামী তিন দিনে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা কম থাকায় নদ-নদীর পানি স্থিতিশীল থাকতে পারে। তবে এরপর ভারী বৃষ্টিপাত হলে বাংলাদেশ ও উজানের দেশগুলোর নদীর পানি আবারও বাড়তে পারে। তার মতে, তিনদিন পর বৃষ্টি বাড়লে সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে দেশের কিছু এলাকায় বন্যার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, ভারতের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী গজলডোবা ও ডৌমুহুনি পয়েন্টে আপাতত নদীর পানি স্থিতিশীল থাকবে এবং আগামী তিন দিন ভারতের তিস্তা অববাহিকাতেও ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই।

বাঁধ ও ব্যারাজের গেট কেন খোলা হয়?

বাংলাদেশের ৫৭টি আন্তঃসীমান্ত নদীর মধ্যে ৫৪টি ভারতের সঙ্গে এবং তিনটি মিয়ানমারের সঙ্গে যৌথভাবে প্রবাহিত। ফলে উজানের দেশগুলোতে অতিবৃষ্টি হলে সেই পানি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ওপর দিয়েই বঙ্গোপসাগরে নেমে আসে।

সম্প্রতি উজানে পানির চাপ বেড়ে যাওয়ায় ভারতের গজলডোবা বাঁধের গেট খুলে দেওয়া হয়েছে। এর চাপ সামাল দিতেই বাংলাদেশও তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি গেট খুলে দিয়েছে। ফলে তিস্তার পাশাপাশি উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অনেক নদীর পানিও বেড়েছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের রংপুর অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব বিবিসি বাংলাকে জানান, ভারতের অংশে তিস্তার বাঁধের কয়েকটি গেট সারা বছরই খোলা থাকে। তবে দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে কোনো চুক্তি না থাকায় ভারত নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী পানি নিয়ন্ত্রণ করে। বর্ষায় পানির চাপ বেড়ে গেলে তারা সব গেট খুলে দেয়।

বন্যা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র এবং যৌথ নদী কমিশন ভারতের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান করে। এফএফডব্লিউসি তিন দিন থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি বন্যার পূর্বাভাস দিতে সক্ষম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তা ও গঙ্গা অববাহিকায় ব্যারাজ নির্মাণের আগেও বাংলাদেশে বন্যা হতো। তবে বাঁধ নির্মাণের পর নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বর্ষাকালে আকস্মিক বন্যা, নদীভাঙন এবং বন্যার তীব্রতা বেড়েছে।

ড. মোহাম্মদ মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, উজানে বাঁধ নির্মাণ, নদীর গভীরতা কমে যাওয়া, নদী ভরাট ও দখলের কারণে বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি আরও বেড়েছে।

তার ভাষায়, “যখন উজানে বৃষ্টি হয় তখন তো আর পানি ধারণ করে রাখতে পারে না, বাঁধ খুলে দেয়। যখন উপর থেকে পানি ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে তখন বন্যা হচ্ছে। আবার যখন পানি থাকে না, তখন আমাদের নদীগুলো ভরাট হচ্ছে, দখল হচ্ছে। একদিকে উজানের দেশগুলো বাঁধ নির্মাণ করে পানি আটকে রাখায় শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। আবার বৃষ্টির মৌসুমে বাঁধ খুলে দিচ্ছে যার ফলে হঠাৎ বন্যা দেখা দিচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের বৃষ্টিপাতের ধরণ খুব বেশি পরিবর্তিত না হলেও খাল, নদী ও নালার ড্রেনেজ ব্যবস্থা সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সক্ষমতা কমে গেছে। এ সমস্যা সমাধানে ভারত ও নেপালের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ওপরও জোর দেন তিনি।

ভারতের সঙ্গে তথ্য লেনদেন

উজানে অতিবৃষ্টি হলে নিজেদের বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারত বাঁধের গেট খুলে দেয়। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণের জন্য গেট বন্ধ রাখা হয়। এর ফলে বর্ষায় বাংলাদেশ আকস্মিক বন্যার মুখে পড়ে, আর শুষ্ক মৌসুমে নদীগুলোতে পানি সংকট দেখা দেয়।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে আন্তঃসীমান্ত নদী, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, বন্যার পূর্বাভাস এবং তথ্য বিনিময় কার্যক্রম চালু রয়েছে। তবে পানি বণ্টন এবং উজানে বাঁধ নির্মাণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের টানাপড়েনও রয়েছে।

বাংলাদেশের অভিযোগ, বন্যার পূর্বাভাস এবং বাঁধের গেট খোলার মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সবসময় সময়মতো পাওয়া যায় না। যদিও ভারত এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান জানান, নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বছরের মে মাস থেকে ভারতের উজানের ১৪টি পয়েন্টের তথ্য বাংলাদেশকে দেওয়া হয়।

তবে যৌথ নদী কমিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী শহীদুর রহমান মনে করেন, ভারতের দেওয়া তথ্য পর্যাপ্ত নয়। তিনি বলেন, “আমরা ভারতের কাছে আরও বেশি তথ্য চাচ্ছি। কিন্তু আমাদের যে প্রত্যাশা সে অনুযায়ী বিপরীত পক্ষ থেকে সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।”

পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, নদীর পানি বণ্টন ও তথ্য আদান-প্রদানের বিষয়ে ভারতের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা চলছে। তিনি বলেন, “বিগত দিনে যেভাবে তারা বাঁধের গেটগুলো খুলে দিত, এই বিষয়গুলো আমরা এখন টাইম টু টাইম মনিটর করছি। তাদের সঙ্গেও আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।”

/এসএন