ঈদুল আজহায় খাবারের টেবিলে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় রেডমিট বা লাল মাংস। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় এ সময় গরু, খাসি কিংবা মহিষের মাংস অনেক বেশি খাওয়া হয়। তবে রেডমিট খাওয়ার ক্ষেত্রে অনেকের মধ্যেই একধরনের ভয় কাজ করে। কেউ উচ্চ রক্তচাপের আশঙ্কা করেন, কেউ হৃদ্রোগ বা হার্ট অ্যাটাকের ভয় পান, আবার অনেকে ওজন বেড়ে যাওয়ার দুশ্চিন্তায় থাকেন। কিন্তু পুষ্টিবিদদের মতে, রেডমিট সবসময় ক্ষতিকর নয়; বরং পরিমিত পরিমাণে খেলে এটি হতে পারে অত্যন্ত উপকারী পুষ্টির উৎস।
সাধারণত স্তন্যপায়ী প্রাণীর মাংসকে রেডমিট হিসেবে ধরা হয়। গরু, খাসি, মহিষ ও ভেড়ার মাংস এ তালিকায় পড়ে। এসব মাংসে মায়োগ্লোবিন নামের প্রোটিন তুলনামূলক বেশি থাকায় মাংস লালচে দেখায়। রেডমিটে সম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ কিছুটা বেশি থাকে, যা রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অনেক গবেষণায় রেডমিটের সঙ্গে হৃদ্রোগ ও প্রোস্টেট ক্যানসারের সম্পর্কের কথাও বলা হয়েছে। তবে চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত নয়, বরং পরিমিত রেডমিট খেলে তা শরীরের জন্য উপকারীই হতে পারে।
রেডমিটকে উচ্চমানের প্রোটিনের অন্যতম উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এতে পর্যাপ্ত আয়রন, জিংক, ফসফরাস ও ক্রিয়েটিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান রয়েছে। পাশাপাশি নিয়াসিন, ভিটামিন বি–১২, থিয়ামিন ও রিবোফ্লাভিনের মতো ভিটামিনও পাওয়া যায়। শরীর গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের এসেনশিয়াল অ্যামিনো অ্যাসিডও রেডমিটে বিদ্যমান। এ ছাড়া রেডমিট ভিটামিন ডির ভালো উৎস, যা হাড়ের গঠন মজবুত করতে সহায়তা করে।
তবে রেডমিট খাওয়ার ক্ষেত্রে বয়স, শারীরিক অবস্থা ও স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় রাখা জরুরি। শিশুদের শরীরের বৃদ্ধি ও বিকাশে প্রোটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রেডমিটে থাকা প্রোটিন শিশুদের শরীর গঠনে ভূমিকা রাখে। আয়রন শিশুদের রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে সহায়তা করে। জিংক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায় এবং ভিটামিন বি স্নায়ুতন্ত্র, চোখ ও ত্বকের সুরক্ষায় কাজ করে। তাই শিশুদের নিয়মিত রেডমিট খাওয়ানোর পরামর্শ দেন পুষ্টিবিদরা। তবে অতিরিক্ত রেডমিট শিশুদের কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণ হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
গর্ভবতী নারীদের জন্যও রেডমিট গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য। বিশেষ করে গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় ট্রাইমিস্টারে অনেক নারীর হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। রেডমিটে থাকা আয়রন রক্তে লোহিত কণিকা তৈরিতে সহায়তা করে। গর্ভাবস্থায় রক্তশূন্যতা দেখা দিলে মা ও গর্ভের শিশুর উভয়েরই স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ কারণে সপ্তাহে অন্তত দুই দিন পরিমিত রেডমিট খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। রেডমিটে থাকা জিংক ও ভিটামিন বি গর্ভস্থ শিশুর বিকাশেও সহায়ক ভূমিকা রাখে।
শুধু গর্ভবতী নারী নয়, যেকোনো বয়সের মানুষের রক্তশূন্যতার অন্যতম কারণ শরীরে আয়রনের ঘাটতি। রেডমিট আয়রনের ভালো উৎস হওয়ায় রক্তস্বল্পতায় এটি উপকারী খাদ্য হতে পারে। তবে থ্যালাসেমিয়াজনিত রক্তশূন্যতায় আক্রান্তদের জন্য রেডমিট খাওয়া নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
৪৫ বছরের বেশি বয়সীদের রেডমিট খাওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। এ বয়সে শরীরের বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যায় এবং ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও উচ্চ কোলেস্টেরলের ঝুঁকি বাড়ে। তবে যাদের এলডিএল ও কোলেস্টেরলের মাত্রা স্বাভাবিক এবং হৃদ্রোগ বা উচ্চ রক্তচাপ নেই, তারা পরিমিত পরিমাণে রেডমিট খেতে পারেন।
কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রেও রেডমিট খাওয়ার বিষয়ে সতর্কতা রয়েছে। স্টেজ–৩ বা এর পরবর্তী ধাপের কিডনি রোগীদের রেডমিট খেতে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ এতে উচ্চ রক্তচাপ ও ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বাড়তে পারে। তবে স্টেজ–১ ও স্টেজ–২–এর রোগীরা প্রতি দুই সপ্তাহে একবার পরিমিত পরিমাণে রেডমিট খেতে পারেন।
অনেকে ওজন কমানোর জন্য রেডমিট খাওয়া বন্ধ করে দেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, মাংস নিজে ওজন বাড়ায় না; বরং অতিরিক্ত চর্বি ও ঝোল ওজন বৃদ্ধির জন্য দায়ী। তাই রক্তে কোলেস্টেরল ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকলে চর্বিবিহীন রেডমিট পরিমিত পরিমাণে খাওয়া যেতে পারে।
রেডমিট খাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম মেনে চলারও পরামর্শ দিয়েছেন পুষ্টিবিদরা। সপ্তাহে এক দিনের বেশি রেডমিট না খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বয়সে কম গরু, খাসি বা মহিষের মাংসে সম্পৃক্ত চর্বি কম থাকায় সেগুলো বেছে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। রান্নায় অতিরিক্ত তেল ব্যবহার না করে স্বল্প পরিমাণে সরিষার তেল বা সানফ্লাওয়ার তেল ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। মাংস কাটার সময় অতিরিক্ত চর্বি ফেলে দিতে হবে এবং ঝোল কম খেতে হবে।
রেডমিটের সঙ্গে ভিটামিন সি–সমৃদ্ধ খাবার, যেমন লেবু খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। রান্নায় টমেটো বা আলুবোখারার মতো পটাশিয়ামসমৃদ্ধ সবজি ব্যবহার করলে তা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত রেডমিট খাওয়ার প্রবণতা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। কারণ অতিরিক্ত রেডমিট কোষ্ঠকাঠিন্যের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই মাংসের সঙ্গে সবজি ও সালাদ খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পুষ্টিবিদদের মতে, রেডমিট নিয়ে অযথা ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। বয়স, ওজন, উচ্চতা, বিএমআই ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় রেখে পরিমিত পরিমাণে রেডমিট খেলে তা শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে। শিশুদের প্রতি কেজি ওজনের জন্য দৈনিক ১ দশমিক ৫ থেকে ২ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন হয়। পূর্ণবয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রতি কেজি ওজনের জন্য প্রয়োজন ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৫ গ্রাম প্রোটিন। প্রতি ১০০ গ্রাম রেডমিটে গড়ে প্রায় ২২ গ্রাম প্রোটিন থাকে। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়ারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।