তর্ণিকা হাজরা
মায়ের সঙ্গে আমার দূরত্ব প্রায় আট হাজার মাইল। সাহিত্যের ভাষায় বললে, যেন সাত সমুদ্র তেরো নদীর ব্যবধান। তাঁর কাছে পৌঁছাতে হলে দীর্ঘ আকাশপথ পাড়ি দিতে হয়, প্লেনে চড়ে মহাদেশের পর মহাদেশ অতিক্রম করতে হয়। বাংলাদেশ আর আমেরিকার এই ভৌগোলিক দূরত্ব মানচিত্রে যত বড়ই হোক, হৃদয়ের হিসেবে আমাদের দূরত্ব একেবারেই শূন্য। কারণ আজও আমি মায়ের আদর্শ, শিক্ষা আর ভালোবাসাকেই জীবনের পথচলার মূল শক্তি হিসেবে বয়ে নিয়ে চলেছি।
প্রতিদিন ভিডিও কলে মায়ের মুখ দেখি। মা আগের মতোই হাসিমুখে জিজ্ঞেস করেন, “খেয়েছিস?”, “এত রাত পর্যন্ত জেগে থাকিস না”, “তোকে কী কী করতে হয় আমি সব বুঝি।” কথাগুলো খুব সাধারণ, অথচ হাজার মাইল দূরে বসে এই সাধারণ কথাগুলোই বুকের ভেতর গভীর শূন্যতা তৈরি করে। ফোনের স্ক্রিনে মায়ের মুখ দেখা যায়, কিন্তু তাঁর পাশে গিয়ে বসা যায় না, কাঁধে মাথা রেখে নিশ্চিন্ত হওয়া যায় না।
ক্লান্ত বিকেলগুলোতে খুব ইচ্ছে করে মায়ের কোলে মাথা রাখতে। তাঁকে জড়িয়ে ধরে সব ক্লান্তি ভুলে যেতে। কিন্তু দূরত্বের বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়—পৃথিবীর সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তিও কখনো মায়ের স্পর্শের বিকল্প হতে পারে না।
এমন খুব কম দিনই যায়, যেদিন মায়ের কথা মনে করে চোখ ভিজে ওঠে না। কখনো রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে মনে হয়, মা হলে হয়তো রান্নাটা অন্যভাবে করতেন। কখনো মেয়েকে ঘুম পাড়াতে গিয়ে মনে পড়ে যায়, ছোটবেলায় আমাকেও নিশ্চয়ই এভাবেই রাত জেগে আগলে রেখেছিলেন তিনি।
নিজে মা হওয়ার পর যেন নতুন করে আমার মাকে আবিষ্কার করেছি। মেয়ের জন্য যা কিছু করি, তার প্রতিটি অনুভূতি যেন মায়ের কাছ থেকেই উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া। অনেকেই বলেন, মাকে ছাড়া মা হওয়া খুব কঠিন। অথচ আমি প্রতিটি মুহূর্তে মায়ের উপস্থিতি অনুভব করেই মা হয়ে উঠছি।
মেয়েকে আদর করার ভঙ্গিতে, বকাঝকা করার পর অপরাধবোধে, তাকে ধৈর্য ধরে পড়া শেখানোর ভেতরে প্রতিদিন আমার নিজের মাকে খুঁজে পাই। এখন বুঝতে পারি, মা শুধু একজন মানুষ নন। মা মানে আশ্রয়, নিঃশব্দ আত্মত্যাগ, নির্ভরতার আরেক নাম। মা মানে এমন এক ভালোবাসা, যার কোনো শেষ নেই।
আমার প্রতিটি সাফল্যের পেছনেও মায়ের অবদান জড়িয়ে আছে। দূরদেশে বসে পড়াশোনা, নতুন জীবনের সংগ্রাম, প্রতিদিন নিজেকে গড়ে তোলার যে শক্তি পাই, তার শেকড়ও মায়ের কাছেই। ছোটবেলা থেকে দেখেছি, মা নিঃশব্দে দায়িত্ব পালন করেছেন, নিজের ক্লান্তি আড়াল করে হাসিমুখে সব সামলেছেন। কঠিন সময়েও তাঁকে ভেঙে পড়তে দেখিনি কখনো। হয়তো সে কারণেই জীবনকে সহজে ছেড়ে দিতে শিখিনি আমিও।
আমার প্রতিটি চেষ্টা, প্রতিটি স্বপ্নের ভেতর কোথাও না কোথাও মায়ের শেখানো সাহস মিশে আছে।
বিদেশের ব্যস্ত জীবনে এমন অসংখ্য মুহূর্ত আসে, যখন খুব করে মাকে ছুঁতে ইচ্ছে করে। শুধু তাঁর পাশে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকতে, মায়ের গায়ের সেই চেনা গন্ধটুকু অনুভব করতে, মাথায় তাঁর আলতো হাতের স্পর্শ পেতে মন কাঁদে।
তখন নিজেকে বুঝাই—আমি আসলে আজও মায়ের স্বপ্নের ভেতর দিয়েই হেঁটে চলেছি।
— তর্ণিকা হাজরা
ফ্লোরিডা, আমেরিকা
/এইচটি