ভারত যেমন নেপালের কিছু ভূখণ্ড নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে বলে অভিযোগ রয়েছে, তেমনি নেপালও ভারতের কিছু এলাকা দখলে রেখেছে বলে মন্তব্য করেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। একই সঙ্গে দুই দেশের দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ সমাধানে যুক্তরাজ্যের সম্পৃক্ততার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রোববার (৩১ মে) নেপালের পার্লামেন্টে বক্তব্য দিতে গিয়ে এ মন্তব্য করেন বালেন্দ্র শাহ। নেপালি সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্টের এক প্রতিবেদনে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেপালের পার্লামেন্টে শ্রম সংস্কৃতি পার্টির নেতা আরেন রাইয়ের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জানতে পেরেছেন যে শুধু ভারতই নেপালের ভূখণ্ড দখল করেনি, নেপালও বিভিন্ন স্থানে ভারতের কিছু ভূখণ্ড নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।
বালেন্দ্র শাহ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর আমি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জানতে পেরেছি, শুধু ভারতই নেপালের জমি দখল করেনি, নেপালও বিভিন্ন স্থানে ভারতের জমি দখল করেছে। বিষয়টি নিয়ে উভয় পক্ষকে বসে বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করতে হবে।’
অন্যদিকে, নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি (ইউনিফায়েড মার্কসিস্ট-লেনিনিস্ট) দলের উপ-সংসদীয় নেতা পদ্ম আরিয়ালের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি লিপুলেখ ও লিম্পিয়াধুরা নিয়ে চলমান বিরোধ প্রসঙ্গেও কথা বলেন। এ বিষয়ে তিনি জানান, যেকোনো পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান খোঁজা হবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, সীমান্ত বিরোধের বিষয়ে নেপাল ইতোমধ্যে প্রতিবেশী চীন এবং যুক্তরাজ্যের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছে। তার ভাষ্য, ‘আমরা শুধু ভারত ও চীনের সঙ্গেই নয়, যুক্তরাজ্য সরকারের সঙ্গেও কথা বলেছি। আমাদের ধারণা, এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যেরও আগ্রহী হওয়া উচিত। কারণ সমস্যাটির সূত্রপাত সেই সময়ের সঙ্গে জড়িত, যখন ব্রিটিশ সরকার ভারত ত্যাগ করেছিল।’
তিনি বলেন, নেপাল ইতোমধ্যে ভারত সরকারের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক নোট পাঠিয়েছে। ওই নোটের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে শাহ জানান, ভারত জানিয়েছে যে উভয় দেশ ইতিহাসবিদ, জরিপবিদ এবং সংশ্লিষ্ট ভূখণ্ড সম্পর্কে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি দল গঠন করবে। পরে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হবে।
এর আগে চলতি বছরের মে মাসের শুরুতে ভারত লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ ও কালাপানি অঞ্চল নিয়ে নেপালের দাবি প্রত্যাখ্যান করে। গত ৩ মে নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে দাবি করেছিল, ১৮১৬ সালের সুগৌলি চুক্তির পর থেকেই মহাকালী নদীর পূর্বে অবস্থিত লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ ও কালাপানি নেপালের অবিচ্ছেদ্য ভূখণ্ড।
নেপাল আরও জানায়, তারা কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে ভারত ও চীন—উভয় দেশকেই নিজেদের উদ্বেগের বিষয়গুলো অবহিত করেছে। পাশাপাশি বিতর্কিত এলাকাগুলোতে সড়ক নির্মাণ বা সম্প্রসারণ, সীমান্ত বাণিজ্য এবং তীর্থযাত্রা সংক্রান্ত কোনো একক কার্যক্রম পরিচালনা না করার জন্য ভারতকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এছাড়া নেপাল আনুষ্ঠানিকভাবে চীনকেও জানিয়েছে যে লিপুলেখ এলাকা তাদের ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত বলে তারা মনে করে।
নেপালের ওই বিবৃতির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান বরাবরের মতোই স্পষ্ট ও অপরিবর্তিত। তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিপুলেখ পাস ১৯৫৪ সাল থেকে কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার স্বীকৃত পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
এরও কয়েক দিন আগে, ১ মে ভারত ঘোষণা দেয় যে ২০২৬ সালের কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রা জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৫০ জন করে তীর্থযাত্রী নিয়ে ১০টি দল উত্তরাখণ্ডের লিপুলেখ পাস দিয়ে যাত্রা করবে। পাশাপাশি আরও ১০টি দল সিকিমের নাথু লা পাস ব্যবহার করবে।
এদিকে নয়াদিল্লিতে অবস্থিত চীনা দূতাবাসও কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রা পুনরায় চালুর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। দূতাবাস জানিয়েছে, চলতি বছরে এক হাজার ভারতীয় তীর্থযাত্রীর সফর সহজ করতে চীন প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবে।
/এসএন