• ঢাকা
  • রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২৯ এএম


মোদি সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে আলোচনায় নেহা বোরা, তরুণ আন্দোলনকারীদের নতুন মুখ

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ ৭:৩২ পিএম

মোদি সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে আলোচনায় নেহা বোরা, তরুণ আন্দোলনকারীদের নতুন মুখ

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিরুদ্ধে চলমান তরুণদের আন্দোলনে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন ২৯ বছর বয়সী ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা। গত সপ্তাহে নয়াদিল্লিতে হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে আটক করে পুলিশ। ওই সময় বারবার ব্যারিকেড টপকে নিরাপত্তা বাহিনীর বাধা এড়িয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন নেহা। একপর্যায়ে পুলিশ তাঁকে টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তুললেও জানালা দিয়ে স্লোগান দিতে থাকেন তিনি। আটকের পর মুক্তি পেয়েই আবার রাজপথে ফিরে আসেন এই ছাত্রনেত্রী।

নেহার এমন আপসহীন অবস্থান মোদি সরকারের বিক্ষোভ দমনে নেওয়া কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। ‘ককরোচ’ বা ‘তেলাপোকা’ নামে পরিচিত যুব আন্দোলনের নেতারা আটক হওয়া এবং বড় বিক্ষোভের পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হওয়ার পরও নেহা ও বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো রাজপথে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে।

ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওর কারণে নেহা এখন জাতীয় পর্যায়ের বিরোধী রাজনীতিতে পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন।

তরুণদের ক্ষোভের প্রতিফলন

সাম্প্রতিক সময়ে নেহার রাজনৈতিক উত্থান ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে তরুণ প্রজন্মের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে রাজধানী নয়াদিল্লিতে এসব উদ্বেগ তীব্র হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিও জোরালো হচ্ছে।

সোমবার বিরোধী দলের একটি সমাবেশে হাজার হাজার মানুষ নেহাকে ঘিরে ধরেন। পরদিন মঙ্গলবার কয়েক ডজন নেতার সঙ্গে সংবাদ সম্মেলনেও অংশ নেন তিনি। তাঁদের অধিকাংশই পুরুষ এবং বয়সে নেহার প্রায় দ্বিগুণ।

মোদি নিজেকে একজন ‘শক্তিশালী নেতা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। একই সঙ্গে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে ভিন্নমত দমন এবং আন্দোলনকারীদের কারাগারে পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের অনেকেই বছরের পর বছর বিচার ছাড়াই বন্দি রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মোদি ক্ষমতায় আসার সময় নেহার বয়স ছিল ১৭ বছর। ক্যাম্পাসের বামপন্থী রাজনীতিতে এক দশকের সক্রিয়তার মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ এবং ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার বিষয়টি প্রত্যক্ষ করেছেন তিনি।

ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সম্পর্কে নেহা বলেন, ‘তারা গণতন্ত্রের সীমা নতুন করে নির্ধারণ করেছে, জবাবদিহিতার সীমা নতুন করে নির্ধারণ করেছে, এমনকি ভিন্নমত প্রকাশের সীমাও নতুন করে নির্ধারণ করেছে। যেহেতু তারা সবকিছুর সংজ্ঞাই বদলে দিচ্ছিল, তাই আসলে কী ঘটছিল, বা আমাদের জন্য তারা ঠিক কী ধরনের কৌশল বা “প্লেবুক” তৈরি করছিল, তা বুঝতে আমাদের কিছুটা সময় লেগেছে।’

ভোটার তালিকা নিয়ে অভিযোগ, বিক্ষোভে পুলিশের বাধা

গত সপ্তাহান্তে তরুণদের বিভিন্ন সংগঠন ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকায় কারচুপি করে অন্যায্য নির্বাচনী সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ তোলে। এর প্রতিবাদে তারা নিজেদের এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেয়।

পুলিশ বিক্ষোভকে অবৈধ ঘোষণা করে নয়াদিল্লির কেন্দ্রীয় এলাকা অবরুদ্ধ করে এবং আন্দোলনের আয়োজকদের আটক করে। কর্তৃপক্ষ বড় ধরনের জমায়েত ঠেকাতে সক্ষম হলেও শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

ছাত্র সংগঠনগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে আন্দোলনের খবর ছড়িয়ে দেয়। এতে বড় সমাবেশ বাধাগ্রস্ত হলেও আন্দোলনটি ব্যাপক আকার ধারণ করেছে—এমন বার্তা ছড়িয়ে পড়ে।

বিজেপি-সমর্থক পরিবার থেকে বামপন্থী রাজনীতিতে

নেহা এমন একটি সামরিক পরিবারে বেড়ে ওঠেন, যেখানে মোদি-সমর্থিত ডানপন্থী বিজেপির আদর্শের প্রতি সমর্থন ছিল। ২০১৬ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তিনি বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। এতে তাঁর পরিবারের ভেতরে মতপার্থক্য তৈরি হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে তিনি ‘সাংওয়ারি’ নামের একটি পথনাট্য দলের সঙ্গে যুক্ত হন। দলটি বিভিন্ন জনসমাগমস্থল ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় নাটক পরিবেশন করত। পাশাপাশি অধ্যাপক ও কবিদের নিয়ে সামাজিক ন্যায়বিচারবিষয়ক আলোচনা আয়োজন করত।

এই দলের সঙ্গে কাজ করতে গিয়েই নেহা গান, অভিনয় এবং রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন।

পাঁচ বছর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কৃষকদের একটি বিক্ষোভে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় চা পান করছেন নেহা। সেখানে সাংবাদিকের অবজ্ঞাসূচক সুর এবং বারবার কথার মাঝে বাধা দেওয়ার ঘটনায় তাঁকে বিরক্ত হতে দেখা যায়।

ক্যাম্পাসভিত্তিক সক্রিয়তা ও দীর্ঘদিনের পথনাটকের অভিজ্ঞতা তাঁকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের মাধ্যমে ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা করতে দক্ষ করে তুলেছে। বিশেষ করে শক্তিশালী শাসক ও তাঁর অনুসারীদের কাউকে ‘দেবতুল্য’ করে তোলার প্রবণতাকে তিনি ব্যঙ্গের মাধ্যমে আক্রমণ করেন।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে অনশন

চলতি বছরের শুরুর দিকে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে ক্ষোভের মধ্যে নেহা অন্য ছাত্রনেতাদের সঙ্গে একটি অনশন কর্মসূচিতে যোগ দেন। ভারতের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক এই কর্মসূচির ডাক দিয়েছিলেন।

পুলিশ প্রথমে জোরপূর্বক অবস্থান কর্মসূচি ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর মোদি সরকার নতি স্বীকার করে এবং দেশটির শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করেন। ঘটনাটি দেশজুড়ে মনোযোগ আকর্ষণ করে এবং নেহাকেও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

বর্তমানে থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিষয়ে ডক্টরেট গবেষণা করছেন নেহা। নয়াদিল্লির নির্ধারিত বিক্ষোভস্থলে প্রতিবাদ করার জন্য সরকারি অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতাকেও চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন তিনি।

নেহা বলেন, ‘ক্ষমতার একটি বিশাল প্রদর্শনী তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। এর উদ্দেশ্য হলো মানুষের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া। তবে এটাও সত্য এবং ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, এই ক্ষমতাকে কেবল একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্তই সুসংহত রাখা সম্ভব।’

নেহা বোরার এই উত্থান ভারতের তরুণদের আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বেকারত্ব, শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়ম, নারীদের নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক জবাবদিহির মতো বিষয়গুলোকে সামনে রেখে আন্দোলনকারীরা কতটা দীর্ঘস্থায়ী চাপ তৈরি করতে পারেন, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে।

সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস

/এএসএফ