দিল্লির যন্তর মন্তরে নিট প্রশ্নফাঁস এবং শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে চলমান আন্দোলনে প্রচলিত স্লোগানের পাশাপাশি নতুন এক প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে মিম, রিলস, ব্যঙ্গাত্মক পোস্টার এবং পপ কালচার। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে পরিচালিত এই আন্দোলনের অন্যতম চালিকাশক্তি জেন-জি প্রজন্ম, যারা সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কার্যকর মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে হাস্যরস ও ব্যঙ্গকে।
যন্তর মন্তরের এক পাশে উচ্চস্বরে বাজছে দেশাত্মবোধক গান ‘সারে জাঁহা সে আচ্ছা’। অন্যদিকে আন্দোলনস্থলে স্বেচ্ছাসেবকেরা পরিচালনা করছেন অস্থায়ী মেডিক্যাল ক্যাম্প। এরই মধ্যে একটি সাদা চার্ট পেপারে ব্যঙ্গাত্মক পোস্টার আঁকতে ব্যস্ত দেখা যায় ২৭ বছর বয়সী আন্দোলনকারী পি হোসেন খানকে।
তার তৈরি পোস্টারে লেখা, ‘আমার সাবেক প্রেমিকা এবং এই সরকার, দুজনেই হৃদয়হীন।’ লেখার অক্ষরের ওপর বিন্দুর জায়গায় তিনি এঁকেছেন একটি ছোট্ট হৃদয়ের প্রতীক।
নিজেকে একজন ‘মিমার’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে পি হোসেন খান বলেন, সরকার যখন শিক্ষার্থীদের দাবিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না, তখন হয়তো হাস্যরস ও ব্যঙ্গই তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। তার ভাষায়, ক্ষমতার বিরুদ্ধে হাসি একটি সূক্ষ্ম হলেও কার্যকর প্রতিরোধের মাধ্যম। তিনি জানান, গত ২০ দিনেরও বেশি সময় ধরে আন্দোলনস্থলে অবস্থান করছেন এবং এক সপ্তাহের অনশন কর্মসূচিতেও অংশ নিয়েছেন।
যন্তর মন্তরের আন্দোলনে দিন দিন বাড়ছে মিম ও ব্যঙ্গাত্মক পোস্টারের ব্যবহার। কোথাও ব্যক্তিগত সম্পর্কের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতির তুলনা করা হচ্ছে, আবার কোথাও সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র কটাক্ষ তুলে ধরা হচ্ছে।
একটি পোস্টারে লেখা হয়েছে, ‘কেউ আমাকে টাকা দেয় না, আমি বিনামূল্যে এই সরকারকে ঘৃণা করি।’ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বিরোধী দল বা বিদেশি শক্তির অর্থায়নের অভিযোগের জবাব হিসেবেই ব্যঙ্গাত্মকভাবে এই বার্তা দেওয়া হয়েছে।
আরেকটি পোস্টারে লেখা, ‘পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে অন্তর্মুখীরাও ঘর থেকে বেরিয়ে আন্দোলনে এসেছে।’
পপ কালচারও আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছে। রণবীর কাপুর ও শ্রদ্ধা কাপুর অভিনীত ‘তু ঝুঠি ম্যায় মক্কার’ সিনেমার পোস্টার নতুনভাবে তৈরি করে সেখানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ছবি যুক্ত করা হয়েছে।
এছাড়া মহাভারতের কৃষ্ণ-অর্জুন সংলাপ ব্যবহার করেও পোস্টার তৈরি করা হয়েছে। সেখানে অর্জুনের জায়গায় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বসিয়ে লেখা হয়েছে, ‘সবাই আমার বিরুদ্ধে, মাধব।’ এর উত্তরে কৃষ্ণের সংলাপ হিসেবে লেখা হয়েছে, ‘আগে পদত্যাগ কর ভাই।’
আরেকটি প্ল্যাকার্ডে নিট প্রশ্নফাঁসের ঘটনার সঙ্গে ঋতুস্রাবের তুলনা করে লেখা হয়েছে, ‘জাতীয় পরীক্ষা সংস্থার চেয়ে আমার স্যানিটারি প্যাড বেশি লিকপ্রুফ।’
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির সম্পর্ক নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ‘মেলোডি’ প্রসঙ্গও স্থান পেয়েছে আন্দোলনের পোস্টারে। দুই শিক্ষার্থী সানা ও মুসকান একটি প্ল্যাকার্ডে লিখেছেন, ‘মেলোডি খাও, দেশ খেয়ো না।’
এদিকে পুলিশের ধাওয়া থেকে শিক্ষার্থীদের দৌড়ে পালানোর ভিডিও সম্পাদনা করে ‘সাবওয়ে সারফার্স’ গেমের আদলে রিল তৈরি করা হয়েছে। যারা আন্দোলনে সরাসরি অংশ নিতে পারেননি, তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখছেন, যন্তর মন্তরে ‘সাবওয়ে সারফার্স’ খেলতে না পারার আক্ষেপ তাদের তাড়া করছে।
টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপের ঘটনার পর আরেকটি ভাইরাল রিলে বলা হয়, ‘পুলিশকে বলো আমি যমুনাপাড়ে থাকি… এর চেয়ে বেশি ঝাঁজালো গ্যাস আমাদের ড্রেনেই থাকে।’
দিল্লি কলেজ অব আর্টের ১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থী সানা বলেন, পাঁচ দিন পর তার পরীক্ষা থাকলেও আন্দোলনে যোগ দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেছেন তিনি। তার ভাষায়, আজ নিট নিয়ে আন্দোলন হলেও আগামীকাল অন্য কোনো শিক্ষার্থী একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যন্তর মন্তরের এই আন্দোলন শুধু রাজপথে সীমাবদ্ধ নয়; এর একটি বড় অংশ পরিচালিত হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। পোস্টার, মিম এবং রিলসের মাধ্যমে জেন-জি এমন একটি প্রতিবাদী সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে, যেখানে হাস্যরস রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, এই আন্দোলনে তরুণদের সৃজনশীলতা দেখিয়েছে যে ডিজিটাল যুগে প্রতিবাদের ভাষাও বদলে গেছে। প্রচলিত স্লোগানের পাশাপাশি মিম, ব্যঙ্গ এবং পপ কালচার এখন আন্দোলনের সমান গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
/এসএন