বিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানে ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের অভাব বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, রাজশাহী সিটি করপোরেশন ও ঝিনাইদহের শৈলকুপা পৌরসভার ৮৯ শতাংশ পরিবার বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে জীবনমান উন্নত হওয়ার কথা জানিয়েছে। তবে ৬৯ শতাংশ পরিবার আয় বৃদ্ধির তুলনায় বিদ্যুৎ বিলের অতিরিক্ত চাপ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। এ ছাড়া ৫৫ শতাংশ পরিবার বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতাকে খারাপ বা খুব খারাপ বলে উল্লেখ করেছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আয়োজিত এক গণসংলাপে সমীক্ষার এসব ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
এক দশকে জীবনযাত্রার মানে উন্নতি
রাজশাহীর ৩৩৪টি এবং শৈলকুপার ২২২টিসহ মোট ৫৫৬টি পরিবারের ওপর পরিচালিত সমীক্ষায় দেখা গেছে, গত এক দশকে প্রান্তিক বা লাইফলাইন গ্রাহকদের বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারের ৮৫ শতাংশ জানিয়েছে, তাদের বিদ্যুৎ ব্যবহার বেড়েছে। একই সময়ে ৭৭ শতাংশ পরিবারের বাসায় বিভিন্ন ধরনের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে।
সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, এসব পরিবারের মধ্যে ফ্রিজ ব্যবহারের হার ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে, টেলিভিশন ব্যবহারের হার ৩৪ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮ শতাংশে।
বিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে জীবনযাত্রায় আরও কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের তথ্য উঠে এসেছে সমীক্ষায়। এতে দেখা গেছে, ৭৬ শতাংশ পরিবার শিশুদের পড়াশোনার পরিবেশ উন্নত হওয়ার কথা জানিয়েছে। পাশাপাশি ৯৭ শতাংশ পরিবার রাতে নিরাপত্তাবোধ বাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
১৩২ মেগাওয়াট-পিক ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা
সমীক্ষায় দেশের ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। সরকারি ৩১টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫২.৫০ মেগাওয়াট-পিক, ১৫০টি কলেজে ৫১.১২ মেগাওয়াট-পিক, রাজশাহী সিটি করপোরেশনে ২৪.৬০ মেগাওয়াট-পিক এবং শৈলকুপা পৌরসভায় ৪.০৬ মেগাওয়াট-পিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে।
সব মিলিয়ে এসব স্থাপনায় ১৩২.২৮ মেগাওয়াট-পিক ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুনির্দিষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে বলে সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হবে বলে জানানো হয়।
বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য দিয়ে দারিদ্র্য শনাক্তের প্রস্তাব
পরিবারভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য বিশ্লেষণ করে সরকারি অতিরিক্ত ব্যয় কমানোর মাধ্যমে দরিদ্র পরিবার শনাক্ত করার একটি প্রস্তাব দিয়েছে ক্যাব। সংগঠনটি তাদের মূল প্রবন্ধে এ বিষয়ে ১২ দফা কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরে।
ক্যাবের দাবি, প্রস্তাবিত পদ্ধতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ২ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২১৬ কোটি টাকার মতো পৃথক প্রকল্প ব্যয় সাশ্রয় করা সম্ভব।
তবে গণসংলাপে অংশ নেওয়া আলোচকেরা এ পদ্ধতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন। তাঁদের মতে, দুর্গম ও চরাঞ্চলের অনেক মানুষ এখনো বিদ্যুৎ সুবিধার বাইরে রয়েছেন। আবার অনেক দরিদ্র পরিবার যৌথভাবে একটি মিটার ব্যবহার করে। ফলে শুধু বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে দারিদ্র্য নির্ধারণ করা হলে ভুল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতে জবাবদিহি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব
গণসংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। তিনি বিদ্যুৎ খাতে বিগত সরকারের দায়মুক্তি আইনের কঠোর সমালোচনা করেন এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানির উৎস শক্তিশালী করা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে সরকারের কার্যকর নীতি ও প্রণোদনা দেওয়ার দাবি জানান। অন্যদিকে, স্ট্যামফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক শিহাব উদ্দিন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দক্ষ জনবল তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন।
সরকারের কাছে ক্যাবের তিন সুপারিশ
গণসংলাপ শেষে ক্যাব সরকারের কাছে তিনটি প্রধান সুপারিশ তুলে ধরে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য সহায়তা পুনর্মূল্যায়ন, বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি এবং ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণ।
ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনটির জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম।
/এসএন