• ঢাকা
  • শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ০৫:০০ এএম


ঘরে খাবার নেই, কিস্তির চাপ, বাবার ফেরার অপেক্ষায় সন্তানেরা

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৭ মে ২০২৬ ১২:৩৮ পিএম

হাকালুকি হাওরের পানি বৃদ্ধিতে বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে স্ট্রোক করেছেন মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার এক বর্গাচাষি। কয়েক দিন ধরে তিনি সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এদিকে হাসপাতালে তাঁর পাশে রয়েছেন স্ত্রী, আর বাড়িতে তিন সন্তান অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। ঘরে খাবার সংকট, অন্যদিকে রয়েছে ঋণের কিস্তির চাপ।

অসুস্থ কৃষকের নাম বকুল দাস (৪৫)। তিনি জুড়ী উপজেলার পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়নের হাকালুকি হাওরপারের কালনীগড় গ্রামের বাসিন্দা। নিজের কোনো ভিটেমাটি না থাকায় অন্যের জমিতে বসবাস করেন। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা থেকে প্রায় এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে এবার বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন তিনি। কিন্তু অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সেই ফসলের বড় অংশ পানির নিচে চলে গেছে।

বুধবার বিকেলে বকুল দাসের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পরিবারের সদস্যরা উঠানে ভেজা ধান শুকানোর চেষ্টা করছেন। এ সময় একটি বেসরকারি সংস্থার মাঠকর্মী কিস্তি আদায়ে এসে বকুলের অসুস্থতার খবর শুনে ফিরে যান।

স্থানীয় সূত্র জানায়, উপজেলা সদরের ভবানীগঞ্জ বাজারে সড়কের পাশে একটি চায়ের দোকান চালান বকুল দাস। সেই আয়ে সংসার চালানো কঠিন হওয়ায় প্রতিবছর বর্গা জমিতে ধান চাষ করেন। এবার হাকালুকি হাওরের পিংলা বিলের দুগাঙ্গা এলাকায় সাত বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। সম্প্রতি টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে পাঁচ বিঘা জমির ধান তলিয়ে যায়।

স্বজনেরা জানান, ধান নষ্ট হওয়ার দৃশ্য দেখে বাড়ি ফিরে অসুস্থ হয়ে পড়েন বকুল। পরে তাঁকে সিলেটে নিয়ে ভর্তি করা হয়।

বকুলের বড় মেয়ে নীপা রানী দাস স্থানীয় তৈয়বুন্নেছা খানম সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী। টাকার অভাবে এবার এইচএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করতে পারেননি তিনি। ছেলে বিশাল দাস নবম শ্রেণিতে এবং ছোট মেয়ে তিন্নি রানী দাস ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে।

বাবার অসুস্থ হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করে নীপা বলে, ‘কয়েক দিন খুব ঝড়–বৃষ্টি আছিল। ঘর থাকি বাইর অওয়া গেছে না। এর মাঝেই খবর মিলল আওরো পানি বাড়ি গেছে। বৃষ্টির মাঝেই বাবা আওরো রওনা দিলা। সন্ধ্যার সময় বাড়িত আইয়া খুব চিন্তাত পড়লা। ধান গেল গেল কইয়া বাবায় নিজেরে আর সামলাইয়া রাখতা পারলা না। বমি করলা। এর পরে হঠাৎ বিছানাত পড়ি গেলা, মাতকথা নাই। উপজেলার সরকারি হাসপাতালে নিয়া গেলাম। ডাক্তারে পরীক্ষা করি কইলেন স্ট্রোক (মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণজনিত রোগ) অইছে। তাড়াতাড়ি সিলেটে হাসপাতালে নিতে অইব। পরে সিলেট নিয়া ভর্তি করা অইল।’

নীপা জানায়, সাত-আট দিন ধরে তাঁর মা–বাবা সিলেটে আছেন। তাঁর কাছে থাকা সামান্য কিছু টাকা দিয়ে দুই দিনের জন্য তেল, ডাল ও মসলাপাতি কেনা হয়েছিল। এরপর আর কোনো টাকা অবশিষ্ট নেই। বর্তমানে তিন ভাইবোন একই বাড়িতে তাঁদের কাকা রুবেল দাসের ঘরে খাবার খাচ্ছে।

নীপার কথা শেষ হওয়ার পর তাঁর ভাই বিশাল দাস বলে, ‘বাবা সিলেট যাওয়ার পরে এই নিয়া তিন দিন কিস্তির লোক আইছেন। তাঁরারে বুঝাইয়া কইছি। সবাই ফেরত গেছইন। তিন ব্যাংকে ১ লাখ টাকার মতো ঋণ আছে বাবার। আগে বাবায় চা, ধান বেচি কিস্তি দিতা। দোকান বন্ধ, ধান পাওয়ারও আশা নাই। এখন কিস্তি কিলা দিতা। সংসার, বাবার চিকিৎসার খরচ কিলা চলত-অউ চিন্তা-উ আমরা করি। ধান তো গেছে, বাবা সুস্থ অইয়া বাড়ি আইলেই শান্তি।’

নীপা আরও জানায়, পানি ওঠার আগে দুই বিঘা জমির ধান কাটা হয়েছিল। কিন্তু পর্যাপ্ত রোদ না থাকায় সেই ধানের অনেকটিতে চারা গজিয়ে গেছে। তিন ভাইবোন মিলে সেগুলো শুকানোর চেষ্টা করছে।

পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মদনমোহন দাস বলেন, কালনীগড় ও খাকটেকা এলাকার বেশির ভাগ মানুষ দরিদ্র বর্গাচাষি। এবারের ফসলহানিতে প্রায় সবাই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কৃষি বিভাগের ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় বকুল দাসের নামও রয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম খান জানান, আড়াই হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।

জুড়ী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুশফিকীন নূর বলেন, ‘বকুলের পরিবারের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।’

/এইচটি