কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ খননস্থল থেকে নির্গত গ্যাসে টানা তিন দিন ধরে আগুন জ্বলছে। বৃহস্পতিবার আগুনের তীব্রতা আগের দুই দিনের তুলনায় বেড়েছে। আগুনের সঙ্গে ছিটকে বের হচ্ছে কাদামাটিও। এ ঘটনায় ইনানীর দুটি ওয়ার্ডের প্রায় ৪০০ পরিবারের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
ঝুঁকি এড়াতে ঘটনাস্থলের চারপাশে ২০০ মিটার এলাকাজুড়ে সাধারণ মানুষের চলাচল সীমিত করেছে প্রশাসন। বিভিন্ন স্থানে টাঙানো হয়েছে লাল পতাকা এবং দেওয়া হয়েছে কাঁটাতারের বেড়া। তবে এখনো গ্যাস নির্গমন ও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
এদিকে গ্যাসের আগুনের কারণে দুই দিন বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকার পর বিকল্প ব্যবস্থায় সরবরাহ স্বাভাবিক করেছে পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগ। এতে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ গ্রাহক আবার বিদ্যুৎ পাচ্ছেন।
আতঙ্কে স্থানীয় বাসিন্দারা
স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে গ্যাসের নির্গমন ও আগুনের তীব্রতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ইনানীর শফির বিল ও সিকদার বাজার এলাকার আশপাশের বাসিন্দাদের আশঙ্কা, গ্যাসের নির্গমন আরও বেড়ে গেলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল আজিজ বলেন, ‘গত তিন দিন ধরে গ্যাসের আগুন জ্বলছে। আগুনের সঙ্গে ওই স্থান থেকে কাদামাটির মতো কিছু বের হচ্ছে। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষের মধ্যে ভয় ও উদ্বেগ বেড়েছে। আমরা দ্রুত এই সমস্যার সমাধান চাই, যাতে এলাকার মানুষ নিরাপদে থাকতে পারেন।’
আরেক বাসিন্দা হাবীবুর রহমান বলেন, দুই দিন পর এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়েছে। তবে গ্যাস নির্গমন ও আগুন জ্বলার ঘটনায় আতঙ্ক এখনো কাটেনি। বরং গ্যাস আরও দ্রুতগতিতে বের হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, জেলা প্রশাসন ও বাপেক্সের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছেন।
হাবীবুর রহমান আরও বলেন, ‘ঘটনাস্থলের আশপাশে প্রায় ২০০ মিটার এলাকাজুড়ে সাধারণ মানুষের চলাচল সীমিত করা হয়েছে। এখন আমাদের একটাই দাবি, দ্রুত গ্যাস নির্গমন ও আগুন নিয়ন্ত্রণে এনে এলাকাবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক।’
২০০ মিটার এলাকায় চলাচলে নিষেধাজ্ঞা
গ্যাসের আগুনের ঝুঁকি এড়াতে ঘটনাস্থল থেকে ২০০ মিটার পর্যন্ত এলাকায় মানুষের চলাচল সীমিত করেছে প্রশাসন। সড়কসহ আশপাশের বিভিন্ন স্থানে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হয়েছে এবং টাঙানো হয়েছে লাল পতাকা।
ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিস, ইনানী পুলিশ ফাঁড়ি, উখিয়া থানা-পুলিশ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সদস্যরা অবস্থান করছেন।
উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শামশুল আলম বলেন, তাঁর ওয়ার্ডে বড় ইনানী ও ছোট ইনানী নামে দুটি গ্রাম রয়েছে। ছোট ইনানী গ্রামে গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেছে। সেখানে প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০টি পরিবারের বসবাস। সম্ভাব্য ঝুঁকির কারণে এসব পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন।
শামশুল আলম জানান, ঢাকায় থেকে আসা বাপেক্সের প্রকৌশলীরা তাঁদের বলেছেন, গ্যাস যেকোনো সময় যেকোনো স্থান দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে। এ কারণে আপাতত গ্যাস নির্গমনের স্থানটি বন্ধ করা হচ্ছে না।
বিষয়টি পর্যালোচনা করে কীভাবে নিরাপদে গ্যাস নির্গমন বন্ধ করা যায়, তা নির্ধারণের জন্য বাইরের বিশেষজ্ঞ দল আনার বিষয়েও চিন্তাভাবনা চলছে বলে জানান তিনি।
জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জাকির হোসেন বলেন, ‘গত তিন দিন ধরে গ্যাসের আগুন জ্বলছে। এতে আশপাশের প্রায় ৪০০ পরিবারের মানুষ চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করছি। এলাকার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’
আগুনের তাপে গ্যাসের নমুনা সংগ্রহে বাধা
গত দুই দিনের মতো বৃহস্পতিবারও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) তিন সদস্যের বিশেষজ্ঞ দল। ব্যবস্থাপক ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের দলনেতা এস এম নাফিকুন আরহামের নেতৃত্বে দলটি ঘটনাস্থলে যায়।
বাপেক্সের সহকারী ব্যবস্থাপক ইমামুল ইসলাম রোকন বলেন, গ্যাস শনাক্ত করতে ডিটেক্টর নিয়ে তাঁরা ঘটনাস্থলে গেছেন। বাপেক্সের প্রোডাকশন ফিল্ডের একটি দলও আশপাশের অন্য কোনো স্থান দিয়ে গ্যাস বের হচ্ছে কি না, তা শনাক্ত করার চেষ্টা করেছে।
তবে আগুন জ্বলতে থাকায় মূল নির্গমনস্থলে ডিটেক্টর দিয়ে গ্যাস শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। আশপাশের বিভিন্ন স্থানে পরীক্ষা চালিয়েও অন্য কোথাও গ্যাস নির্গমনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।
ইমামুল ইসলাম রোকন আরও বলেন, আগুনের তীব্র তাপের কারণে ঘটনাস্থলের কাছাকাছি গিয়ে গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। প্রায় ২০ থেকে ২৫ ফুট দূর থেকেও প্রচণ্ড তাপ অনুভূত হচ্ছে। এ অবস্থায় আপাতত অপেক্ষা করা ছাড়া তাঁদের আর কোনো উপায় নেই। তবে উপজেলা প্রশাসনকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিকল্প ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক
গ্যাসের আগুনের কারণে দুই দিন বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পর বিকল্প ব্যবস্থায় প্রায় ৩ হাজার ৮০০ গ্রাহকের বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করেছে পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগ।
তবে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও গ্যাস নির্গমন ও আগুন বন্ধ না হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগ কাটেনি। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা এবং এলাকাবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
/এএসএফ