• ঢাকা
  • বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০১:১০ এএম


অনার্স ও এমকমে প্রথম হয়েও শেষ বয়সে বৃদ্ধাশ্রমে রমা রোকসানা

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১২ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৩৫ পিএম

ঢাবিতে দুই পরীক্ষায় প্রথম, আইসিবির কর্মকর্তা—আজ আশ্রয় বৃদ্ধাশ্রমে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে অনার্স ও এমকম—দুই পরীক্ষাতেই প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন রমা রোকসানা। একসময় ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। অথচ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আপনজনদের কাছে আশ্রয় মেলেনি তাঁর। স্বামীর মৃত্যুর পর ৬৭ বছর বয়সে বরিশাল নগরের কাউনিয়ার একটি বৃদ্ধাশ্রমে ঠাঁই হয়েছে এই শিক্ষিত নারীর।

তিন ভাইয়ের একমাত্র বোন হয়েও বর্তমানে নিঃসঙ্গ জীবন কাটছে রমার। তাঁর অভিযোগ, ভাইদের কাছে আশ্রয় চাইতে গেলে তাঁরা তাঁকে বৃদ্ধাশ্রমে চলে যেতে বলেন। পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বারবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত মামার বাড়ির স্বজনেরা তাঁকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে যান।

নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে রমা রোকসানা বলেন, ‘থাকি, আর কী উপায়! ভাইরা কোনোদিন ডাকবে না। যতবার বলছি যে আমি কোথায় যাব, বলে কিনা, না, আমাদের বৃদ্ধাশ্রমে যেতে হবে। আমরা রাখব না। আমার বউ-ছেলের ঝামেলা।’

মেধাবী শিক্ষার্থী থেকে আইসিবির কর্মকর্তা

১৯৭৫ সালে সিদ্ধেশ্বরী স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৭৭ সালে হলিক্রস কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন রমা। এরপর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৮২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগ থেকে অনার্স ও এমকম—দুই পরীক্ষাতেই প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন তিনি।

পড়াশোনা শেষ করে যোগ দেন ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশে (আইসিবি) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে। সেখানে প্রায় আট বছর চাকরি করেন। পরে অসুস্থ মায়ের দেখাশোনার জন্য কর্মজীবন ছেড়ে দেন।

রমার ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে মায়ের মৃত্যুর পর থেকেই তাঁর জীবনে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। ২০০৩ সালে হানিফ হাওলাদার নামের এক ব্যক্তিকে বিয়ে করেন তিনি। রমা ছিলেন তাঁর স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রী। আগের সংসারে স্ত্রী-সন্তান থাকা অবস্থায়ই হানিফ তাঁকে বিয়ে করেন।

স্বামীর ব্যবসায় দিয়েছিলেন ১৭ লাখ টাকা

বিয়ের পর স্বামীর ব্যবসার জন্য নিজের সঞ্চয় থেকে ১৭ লাখ টাকা দেন রমা। তবে এত অর্থ সহায়তা দেওয়ার পরও তাঁর জীবনে স্থায়ী সচ্ছলতা আসেনি। প্রায় তিন বছর আগে স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

স্বামীর সঙ্গে কাটানো সময়ের স্মৃতি স্মরণ করে রমা বলেন, ‘ভালোবাসত লোকটা। স্বামী ২০ বছর সংসার করার পর মারা যায়।’

স্বামীর মৃত্যুর পর কখনো দেবরের পরিবারে, কখনো খালাতো বোনের বাসায় আশ্রয় নেন তিনি। এভাবে এক আশ্রয় থেকে অন্য আশ্রয়ে কাটছিল তাঁর দিন। রমার দাবি, খালাতো বোনের কাছে রাখা জীবনের শেষ সঞ্চয় ৯০ হাজার টাকাও ফেরত পাননি তিনি।

ভাইদের কাছে আশ্রয় না পেয়ে বৃদ্ধাশ্রমে

একপর্যায়ে রমা তাঁর ভাইদের কাছে আশ্রয় চান। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, ভাইয়েরা তাঁকে নিজেদের কাছে রাখতে রাজি হননি। বরং বৃদ্ধাশ্রমে চলে যেতে বলেন।

রমা রোকসানা বলেন, ‘ভাইয়ের কাছে গিয়ে বলি যে আমি আর থাকব না। কয়, আপনি বৃদ্ধাশ্রমে চলে যান। পরে আমি বাধ্য হয়ে আমার মামার বাড়ি আসি। চার দিন থাকার পর মামারা এখানে দিয়ে আসে। এক মাসের একটু বেশি হলো এখানে থাকি।’

বৃদ্ধাশ্রমে থাকার অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘তো মনটা মাঝে মাঝে খারাপ লাগে। অনেক বড় বড় আত্মীয়স্বজন, সবাই লেখাপড়া করেছে, সবার বাড়ি-গাড়ি আছে। কেউ রাখে না। এই বুড়া বয়সে এখানে থাকি।’

পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বিনা মূল্যে দেখাশোনা করছে বৃদ্ধাশ্রম

বৃদ্ধাশ্রমের পরিচালক শাখায়েত হোসেন জানান, বর্তমানে রমা রোকসানার দেখাশোনা করছেন তাঁরা। তাঁর ভাষ্য, রমা একটি শিক্ষিত ও সচ্ছল পরিবার থেকে এসেছেন। ঢাকার মগবাজার এলাকায় তাঁর মা-বাবার বাড়ি ছিল।

শাখায়েত হোসেনের দাবি, স্বামীর মৃত্যুর পর আগের সংসারের ছেলেদের হাতে নির্যাতন ও জোরজবরদস্তির শিকার হয়ে ঘর ছাড়তে বাধ্য হন রমা। এরপর থেকেই তিনি আশ্রয়হীন হয়ে পড়েন।

তিনি বলেন, ‘ভালো শিক্ষিত পরিবার থেকে আসা, ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান উনি। ঢাকা মগবাজার উনার মা-বাবার এলাকা। হাজবেন্ড মারা যাওয়ার পরে আগের ঘরের যে ছেলেরা আছে, তারা এই রমা বেগমকে জোর-জুলুম করে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে। তার পরিপ্রেক্ষিতে উনি এখন আশ্রয়হীন হয়ে গেছেন।’

বৃদ্ধাশ্রমটির কার্যক্রম সম্পর্কে শাখায়েত হোসেন বলেন, অসহায় মানুষের আশ্রয় ও পরিচর্যার জন্যই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে। সেখানে থাকা ব্যক্তিদের সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে লালন-পালন করা হয়। বর্তমানে তাঁর বৃদ্ধাশ্রমে ৭০ জন বৃদ্ধ নারী রয়েছেন। মানুষের সাহায্য-সহযোগিতায় তাঁদের দেখাশোনা করা হচ্ছে।

জীবনের শেষ প্রান্তে নিরাপদ আশ্রয়ের অপেক্ষা

একসময় নিজের মেধা ও পরিশ্রমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অসামান্য সাফল্য অর্জন করেছিলেন রমা রোকসানা। কর্মজীবনে দায়িত্ব পালন করেছেন, আবার অসুস্থ মায়ের সেবার জন্য নিজের ক্যারিয়ারও ছেড়ে দিয়েছেন। স্বামীর ব্যবসায় নিজের সঞ্চয় থেকে অর্থ সহায়তাও দিয়েছেন। অথচ জীবনের শেষবেলায় এসে তাঁকে কাটাতে হচ্ছে আপনজনদের থেকে দূরে, একটি বৃদ্ধাশ্রমে।

রমার এই জীবনকাহিনি একজন উচ্চশিক্ষিত নারীর নিঃসঙ্গতার গল্পের পাশাপাশি বার্ধক্যে নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজনীয়তা, পরিবারের দায়িত্ববোধ এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গুরুত্বও সামনে নিয়ে এসেছে।

/এএসএফ