ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) দুই নবজাতকের মায়ের নাম একই হওয়ায় তাদের অদলবদলের ঘটনা ঘটেছে। পরে এক পরিবারের সন্দেহ হলে বিষয়টি ধরা পড়ে। এরপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকালে দুই শিশুকে তাদের প্রকৃত পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে সোমবার (২৪ আগস্ট) ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এনআইসিইউতে।
জানা গেছে, অদলবদলের ঘটনায় জড়িত দুই পরিবারের সন্তানই গত বৃহস্পতিবার জন্ম নেয়। সরিষাবাড়ীর জগন্নাথবাড়ি এলাকার মাসুদ ইসলাম ও নাদিরা দম্পতির কন্যাশিশুর জন্ম হয় জামালপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে। জন্মের পর শিশুটির শারীরিক জটিলতা দেখা দিলে শনিবার তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এনআইসিইউতে ভর্তি করা হয়।
অন্যদিকে, ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার পুম্বাইল গ্রামের আবু রায়হান ও নাদিরা দম্পতির কন্যাশিশুর জন্ম হয় ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। স্বাভাবিক প্রসবের পর শিশুটির শারীরিক সমস্যা দেখা দিলে তাকেও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এনআইসিইউতে নেওয়া হয়।
দুই নবজাতক একই ইউনিটে চিকিৎসাধীন ছিল। তাদের দুই মায়ের নামও ছিল একই—নাদিরা। তবে তাদের বাবাদের নাম আলাদা।
সোমবার বিকেলে চিকিৎসাধীন সরিষাবাড়ীর নাদিরা বেগমকে ছাড়পত্র দেওয়ার সময় ভুল করে গৌরীপুরের নাদিরা বেগমের সন্তান তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বিষয়টি বুঝতে না পেরে সরিষাবাড়ীর পরিবার শিশুটিকে নিয়ে বাড়ি চলে যায়।
পরে সোমবার সন্ধ্যায় গৌরীপুরের আবু রায়হান সন্তানকে নিতে হাসপাতালে গেলে নবজাতকের চেহারা দেখে পরিবারের সদস্যদের সন্দেহ হয়। তারা সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি জানান এবং শিশুটির পরিচয় যাচাইয়ের দাবি করেন। এ নিয়ে শুরুতে হাসপাতালের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে তাদের কথা-কাটাকাটি হয়।
পরবর্তীতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে যাচাই শুরু করে। একপর্যায়ে নিশ্চিত হওয়া যায়, গৌরীপুরের নবজাতককে ভুল করে সরিষাবাড়ীর পরিবারের কাছে দিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং শিশুটি এরই মধ্যে তাদের সঙ্গে হাসপাতাল ছেড়ে গেছে।
ঘটনার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রাতেই জামালপুরের সরিষাবাড়ীর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এনআইসিইউর একটি দল রাতেই সেখানে গিয়ে নবজাতককে উদ্ধার করে। পরে রাত ৩টার দিকে শিশুটিকে ময়মনসিংহে ফিরিয়ে আনা হয়। পরিচয় নিশ্চিত করার পর মঙ্গলবার সকালে দুই নবজাতককে তাদের নিজ নিজ অভিভাবকের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
গৌরীপুর উপজেলার পুম্বাইল গ্রামের আবু রায়হান জানান, হাসপাতাল থেকে দেওয়া শিশুটির চেহারা তাদের সন্তানের মতো মনে হয়নি। এ কারণে তারা সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি জানান এবং পরিচয় যাচাইয়ের দাবি করেন। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি খতিয়ে দেখে ভুলের বিষয়টি নিশ্চিত করে।
সরিষাবাড়ীর শিশুটির বাবা মাসুদ ইসলাম বলেন, হাসপাতাল থেকে সন্তান তাদের কাছে দেওয়ার সময় তারা কোনো সন্দেহ করেননি। পরে রাতে হাসপাতালের লোকজন এসে শিশুটিকে নিয়ে যান। সকালে সন্তান ফেরত নিতে পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে যান।
স্থানীয় সচেতন মহলের ভাষ্য, নবজাতকের পায়ে থাকা টোকেনে বাবা-মায়ের নাম ও সিরিয়াল নম্বর উল্লেখ থাকে। দুই শিশুর মায়ের নাম একই হলেও তাদের বাবাদের নাম আলাদা। ফলে এতগুলো পরিচয়-তথ্য থাকার পরও কীভাবে একজনের সন্তান অন্য পরিবারের হাতে চলে গেল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাদের মতে, দায়িত্বে কারও অবহেলা থাকলে তা খুঁজে বের করা প্রয়োজন। কারণ, সময়মতো ভুলটি ধরা না পড়লে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারত।
ময়মনসিংহ মঞ্চের সমন্বয়কারী ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, মায়ের নামের মিল থেকে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। তার মতে, এ ঘটনা হাসপাতালের নবজাতক শনাক্তকরণ ও হস্তান্তর ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. জাকিউল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, দুই নবজাতকের মায়ের নাম একই হওয়ায় হস্তান্তরের সময় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। বিষয়টি জানার পর রাতেই ভুল করে দেওয়া শিশুকে ফিরিয়ে আনা হয়। পরে মঙ্গলবার সকালে দুই নবজাতককে তাদের প্রকৃত পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ঘটনাটিকে দায়িত্বে অবহেলা হিসেবে দেখা হচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। দায়িত্ব পালনে কারও গাফিলতি পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
/এসএন