গলা থেকে পা পর্যন্ত মাটিতে পুঁতে রাখা। চারদিকে অন্ধকার। চলছে তন্ত্র-মন্ত্রের নানা আয়োজন। ভয়ংকর শব্দ, অস্বাভাবিক অঙ্গভঙ্গি ও বিভিন্ন কৌশলে তৈরি করা হয় ভৌতিক পরিবেশ। এরপর দাবি করা হয়, সেখানে হাজির হয়েছে জিন, পরী কিংবা কোনো অদৃশ্য শক্তি। পৃথিবীর যেকোনো সমস্যার সমাধান তাদের পক্ষে সম্ভব বলেও প্রচার করা হয়। তবে এর বিনিময়ে চাওয়া হয় হাজার হাজার টাকা থেকে শুরু করে ছাগল, গরু কিংবা মহিষ।
এমনই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার সীমান্তঘেঁষা চৌমহন গ্রামকে ঘিরে। স্থানীয়দের দাবি, ছোট এই গ্রামে কথিত ‘জিনের বাদশা’ ও তান্ত্রিকদের একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের কথিত অলৌকিক ক্ষমতার প্রচার চালিয়ে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া ও ইউরোপে থাকা প্রবাসীদের টার্গেট করা হচ্ছে। ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, পারিবারিক অশান্তি, দাম্পত্য কলহ, সন্তান অবাধ্য হওয়া কিংবা ব্যক্তিগত বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের কথা বলে শুরুতে অল্প পরিমাণ টাকা নেওয়া হয়। পরে কথিত জিন-পরীর ভয় দেখিয়ে ধাপে ধাপে আরও টাকা দাবি করা হয়। কখনো ছাগল, গরু কিংবা মহিষের মূল্যও দাবি করা হয়। একপর্যায়ে আতঙ্কিত হয়ে ভুক্তভোগীরা দাবিকৃত অর্থ পাঠাতে বাধ্য হন বলে অভিযোগ।
মালয়েশিয়া প্রবাসী মো. আলামিন হোসেন জানান, সোহান নামের এক কথিত ‘জিনের বাদশার’ সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ওই ব্যক্তি তার পারিবারিক সমস্যা সমাধানের কথা বলে যোগাযোগ করেন। পরে নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখিয়ে তার কাছ থেকে দেড় লাখ টাকার বেশি নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আলামিন বলেন, তাকে বলা হয়েছিল, আরও টাকা না দিলে তার ‘বংশ নির্বংশ’ করে দেওয়া হবে। এমনকি পরীর মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের তুলে নিয়ে যাওয়ার ভয়ও দেখানো হয়। এভাবে তাকে ক্রমাগত আতঙ্কের মধ্যে রাখা হয়েছিল বলে জানান তিনি।
লন্ডন প্রবাসী বদরুল ইসলাম জানান, শুরুতে রাতে ‘হাজিরা’র জন্য ২১ টাকা বা ৩০০ টাকা চাওয়া হয়। এরপর কথিত জিনের চাহিদার কথা বলে পর্যায়ক্রমে টাকা নেওয়া শুরু হয়।
বদরুলের দাবি, বিকাশের মাধ্যমে তার কাছ থেকে প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। পরে তাকে বলা হয়, ১০১টি ছাগল না দিলে পরী তাকে নিয়ে যাবে এবং তার মৃত্যু হতে পারে। পরিবারের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তিনি ও তার স্বজনেরা আরও টাকা পাঠান বলে জানান।
স্থানীয়দের দাবি, চৌমহন গ্রামের ভোটার সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৫০০। এর মধ্যে অন্তত ৩৭ জন কথিত ‘জিনের বাদশা’ রয়েছেন। প্রত্যেকের সঙ্গে ১০ থেকে ১৫ জন করে সহযোগী কাজ করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। পাশের কুশমাইল ও সংগ্রামপুর গ্রামেও আরও ৮ থেকে ১০ জন কথিত ‘জিনের বাদশা’ রয়েছেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
তবে তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনেকেই ভয় পান। চৌমহন বাজার ও বটতলা মোড় এলাকায় কয়েকজন নারী, তরুণ ও বয়স্ক মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকে জানান, এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে কথা বললে বিপদে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দিনের বেলায় অভিযুক্তরা সাধারণ মানুষের মতোই চলাফেরা করেন। কিন্তু রাত নামলেই শুরু হয় কথিত জিন-ভূতের আসর, ভিডিও ধারণ এবং অনলাইনে প্রচারণা।
চৌমহন এলাকার বাসিন্দা মিঠুন সরদার বলেন, অভিনয় ও ভয় দেখানোর মাধ্যমে কথিত কবিরাজ ও ‘জিনের বাদশারা’ সাধারণ মানুষের বিশ্বাস অর্জন করেছেন। তাবিজ, কুফরি কাজ কিংবা জিন-ভূতের ভয় দেখিয়ে বিপদে পড়া মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
মিঠুন সরদার বলেন, আগে যাদের কেউ বিল-জমিতে কাজ করতেন, আবার কেউ ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন, তাদের অনেকেই এখন দামি মোটরসাইকেল, গাড়ি ও বাড়ির মালিক। রাতারাতি তাদের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
তার অভিযোগ, মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নেওয়ার পর সেই অর্থের সামান্য অংশ মসজিদ-মাদ্রাসায় দান করে নিজেদের ভালো মানুষ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়।
বড়াইগ্রামের বাসিন্দা মখলেসুর রহমান বলেন, জিনের ভয় দেখিয়ে প্রতারণার পাশাপাশি এলাকায় মাদকের বিস্তার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। তার দাবি, এক ইতালি প্রবাসীর কাছ থেকে প্রতারকচক্র এক থেকে দেড় কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
তিনি জানান, টাকা নেওয়ার পর অনেক সময় ব্যবহৃত বিকাশ নম্বর বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে পরবর্তী সময়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এ ধরনের প্রতারণা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
বড়াইগ্রাম উপজেলার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক অহিদুল হক সরকার বলেন, কথিত ‘জিনের বাদশারা’ এলাকার জঙ্গল ও ঝোপঝাড়ে গিয়ে ভৌতিক পরিবেশ তৈরি করেন। কখনো কথিত কবিরাজের ভূমিকায়, আবার কখনো ভুক্তভোগীর চরিত্রে অভিনয় করে ভিডিও ধারণ করা হয়। পরে এসব ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, এসব ভিডিও দেখে দূর-দূরান্তের মানুষ যোগাযোগ করলে তাদের পারিবারিক কিংবা ব্যক্তিগত সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়। এরপর জিন-ভূতের ভয় দেখিয়ে বিকাশের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা নেওয়া হয়।
অহিদুল হক আরও বলেন, যারা আগে দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন, তাদের অনেকেই এখন কয়েক লাখ টাকা দামের মোটরসাইকেল, গাড়ি ও জমির মালিক। প্রবাসীদের সঙ্গে প্রতারণা করেই এসব অর্থ উপার্জন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তার ভাষ্য, একজন দিনমজুর রাতারাতি অর্থবিত্তের মালিক হয়ে যাওয়ায় অন্যরাও একই পথে ঝুঁকছেন।
প্রতারণার শিকার প্রবাসী ও স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কথিত ‘জিনের বাদশা’ ইমরান, রিপন, সম্রাট, রাশিদুল ও রোকনুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে সাংবাদিকদের আসার খবর পেয়ে তারা সরে যান বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ সময় তাদের সহযোগীরা মোটরসাইকেলে সাংবাদিকদের গতিবিধি নজরদারি করেন এবং নানা কটূক্তি ও অসহযোগিতা করেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে, এক কথিত ‘জিনের বাদশা’ মুঠোফোনে স্থানীয় এক সাংবাদিককে হুমকি দিয়েছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফোনে তিনি ‘গুরুজির অভিশাপ’ দেওয়ার কথা বলে ভয় দেখানোর পাশাপাশি মাটির নিচে পুঁতে ফেলার হুমকি দেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়েও তিনি ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে নাটোর জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইফতে খায়ের আলম বলেন, জিনের বাদশা পরিচয়ে প্রতারণার ঘটনায় এরই মধ্যে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এরপরও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এলাকাটির ওপর সতর্ক নজর রাখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, কেউ আশঙ্কা বোধ করলে কিংবা প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত পুলিশকে তথ্য দিতে হবে। পুলিশের গোয়েন্দা ও নিয়মিত তৎপরতা আরও বাড়ানো হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রতারকদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে বলেও জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চৌমহনে গভীর রাত পর্যন্ত কথিত জিন-ভূতের কর্মকাণ্ডের ভিডিও ধারণ ও অনলাইন প্রচারণা চলে। গ্রামের প্রবেশপথসহ বিভিন্ন গাছে গোপনে ক্যামেরা স্থাপনের অভিযোগও রয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ও জীবনযাত্রায় আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
সচেতন মহলের মতে, মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, পারিবারিক দুর্বলতা ও বিপদের সুযোগ নিয়ে এ ধরনের প্রতারণা শুধু আর্থিক ক্ষতিই করছে না, সমাজে ভয় ও কুসংস্কারও ছড়িয়ে দিচ্ছে। প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের প্রতারণামূলক প্রচারণা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
/এসএন