গত কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণ ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তীব্রতা কিছুটা কমলেও রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। জেলার বিভিন্ন এলাকায় এখনো প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দী রয়েছেন। একই সঙ্গে গত ছয় দিনে জেলায় মোট ১০৪টি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
শুক্রবার (১০ জুলাই) থেকে বৃষ্টিপাত কিছুটা কমলেও প্লাবিত গ্রামগুলোর পানি উল্লেখযোগ্যভাবে নামেনি। পাশাপাশি লংগদু, বিলাইছড়ি, নানিয়ারচর, বরকল ও জুরাছড়ি উপজেলার অবস্থারও তেমন পরিবর্তন হয়নি। বন্যার পানি ও পাহাড়ধসের কারণে এসব এলাকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যোগাযোগ বন্ধ থাকায় দুর্ভোগও অব্যাহত রয়েছে।
এরই মধ্যে সেনাবাহিনীর সহায়তায় সাজেকে আটকে থাকা সব পর্যটককে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সাজেকে আর কোনো পর্যটক আটকে নেই।
জেলার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলা বাঘাইছড়ি। পাহাড়ি ঢলে উপজেলার অন্তত ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ৫ হাজার পরিবারের ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। এছাড়া পাহাড়ধসে প্রায় তিন কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বাঘাইছড়ি থেকে দীঘিনালা হয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় দুর্গত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রশাসন বন্যা ও পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, রাঙামাটিতে ৪০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। সরকারি ব্যবস্থাপনায় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর সার্বিক তদারকি জোরদার করা হয়েছে।
তবে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা অনেকের অভিযোগ, তারা প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত খাবার ও ত্রাণ সহায়তা পাচ্ছেন না। আশ্রয়কেন্দ্রে শুকনো ও রান্না করা খাবার বিতরণ করা হলেও প্লাবিত এলাকায় নিজ বাড়িতে অবস্থানরত অনেক পরিবার এখনও পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত বলে অভিযোগ করেছেন।
স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের পাশাপাশি রাঙামাটির সংসদ সদস্য, সাবেক পার্বত্যমন্ত্রী ও স্থানীয় এমপি দীপেন দেওয়ানের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় সেই সহায়তা এখনো অপ্রতুল।
এদিকে এমপি দীপেন দেওয়ান বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করে দুর্গত মানুষের খোঁজখবর নেন এবং ত্রাণ ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। এ সময় তিনি রাঙামাটির বন্যা পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জরুরি হস্তক্ষেপের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, দুর্যোগ-পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় সরকার জরুরি পদক্ষেপ নেবে এবং কোনো ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা পরিবার বাদ পড়বে না।
জেলা প্রশাসনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ছয় দিনে রাঙামাটিতে মোট ১০৪টি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে বিলাইছড়িতে ৩৭টি, কাউখালীতে ৩০টি, বাঘাইছড়িতে ১৫টি, রাঙামাটি সদরে ১৩টি, লংগদুতে ৪টি, কাপ্তাইয়ে ৩টি এবং নানিয়ারচরে ২টি পাহাড়ধসের তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে।
শুক্রবার থেকে বৃষ্টিপাত কমলেও পাহাড়ধসের ঝুঁকি এবং বন্যা পরিস্থিতির কারণে জেলার অনেক মানুষ এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।
বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমানে মারজান জানান, ভারী বর্ষণ কমে যাওয়ায় নতুন করে পানি না বাড়লেও নিচু এলাকাগুলো এখনো প্লাবিত রয়েছে। পানিবন্দী পরিবারগুলোকে দ্রুত উদ্ধার করে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সাজেকে আটকে পড়া পর্যটকদের সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় শনিবার সকালে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চলবে।
রাঙামাটির কোথাও কোথাও বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও পাহাড়ধস, বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং দুর্গত মানুষের খাদ্য ও ত্রাণসংকট মিলিয়ে জেলার দুর্ভোগ এখনো কাটেনি। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমও নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, জেলার বন্যা ও পাহাড়ধস পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে দুর্গত মানুষের জন্য তিন বেলা খাবার, সুপেয় পানি ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি পাহাড়ের পাদদেশ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে বা নিকটস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যেতে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং এবং সচেতনতামূলক প্রচারণা জোরদার করা হয়েছে।
/এসএন