বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক শুধু ভৌগোলিক সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়, বরং দুই দেশের মানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার মধ্যেও গভীরভাবে যুক্ত। তিনি মনে করেন, অভিন্ন স্বপ্ন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতেই দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরালো হবে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) কলকাতায় সংবাদ সংস্থা এএনআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। দায়িত্ব গ্রহণের জন্য আজ শুক্রবার ঢাকায় আসার কথা রয়েছে তার।
এর আগে বৃহস্পতিবার কলকাতার ঐতিহাসিক নেতাজি ভবন পরিদর্শন করেন দীনেশ ত্রিবেদী। সেখানে নিজের অগ্রাধিকারের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের মধ্যকার সম্পর্কই তার প্রধান অগ্রাধিকার।
তিনি বলেন, ‘আমার একমাত্র অগ্রাধিকার হলো বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের সম্পর্ক। আমরা সবাই ভাই-বোন। আমি আগেও বলেছি, আমাদের অভিন্ন লক্ষ্য সীমান্ত নয়, স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নও অভিন্ন। একই আকাশ, একই বাতাস, একই যন্ত্রণা। তাই আমাদের পথ ভুল হওয়ার সুযোগ নেই। প্রয়োজন শুধু ভালোবাসা ও পারস্পরিক আন্তরিকতা। তাহলেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব।’
নেতাজি ভবন পরিদর্শনের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি জানান, এই এলাকার সঙ্গেই তার শৈশবের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। নেতাজি ভবন থেকে প্রায় ৪০০ গজ দূরে তার বাড়ি ছিল এবং সেখানেই তিনি বেড়ে উঠেছেন।
তিনি বলেন, নেতাজিকে ঘিরে যে আবেগ ও মূল্যবোধ, তা নিয়েই তারা বড় হয়েছেন। দায়িত্ব গ্রহণের আগে নেতাজি ভবনে এসে তার কাছ থেকে প্রেরণা নেওয়ার সুযোগকে তিনি বিশেষ সৌভাগ্য হিসেবে দেখছেন।
দীনেশ ত্রিবেদীর ভাষায়, ‘আমরা যে মূল্যবোধগুলো ধারণ করেছি, তার জন্য নেতাজির প্রতি কৃতজ্ঞ। আমার জন্য এর চেয়ে ভালো আর কিছু হতে পারে না যে দায়িত্ব নেওয়ার আগে নেতাজি ভবনে এসে তার থেকে প্রেরণা গ্রহণ করছি এবং গণতন্ত্রের সেই মূল্যবোধগুলো ধারণ করছি, যার জন্য নেতাজি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।’
তিনি আরও বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং দেশের জনগণ তাকে যে দায়িত্ব দিয়েছেন, তা পালনে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, শ্রী অরবিন্দ ও স্বামী বিবেকানন্দসহ দেশের মহান নেতাদের আশীর্বাদ সঙ্গে রয়েছে।
সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক শুধু সীমান্তের নয়। বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্নের সঙ্গেও আমরা যুক্ত। আমাদের স্বপ্ন অভিন্ন। তাই আমি শুধু ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের কথা বলছি না, এর সঙ্গে বাংলাদেশের আরও ২০ কোটি মানুষকে যোগ করছি। এই ১৬০ কোটি মানুষ, যারা আমাদের ভাই-বোন, তাদের কল্যাণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি আশা প্রকাশ করেন, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আশীর্বাদ, ভারতের জনগণের শুভকামনা এবং বাংলাদেশের মানুষের সমর্থন তাকে দায়িত্ব পালনে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে দুই দেশ একসঙ্গে এগিয়ে গিয়ে অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে সফল হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
প্রসঙ্গত, গত এপ্রিলে ভারত সরকার দেশটির সাবেক রেলমন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়। গত ৫ জুন তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছ থেকে বাংলাদেশের জন্য ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে পরিচয়পত্র গ্রহণ করেন।
দুই দেশের ৫৫ বছরের কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো রাজনীতিবিদকে বাংলাদেশে হাইকমিশনার হিসেবে পাঠাচ্ছে ভারত। তিনি পেশাদার কূটনীতিক প্রণয় ভার্মার স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন।
৭৫ বছর বয়সী দীনেশ ত্রিবেদীর রাজনৈতিক জীবন দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য। আশির দশকে তিনি কংগ্রেসে যোগ দিলেও ১৯৯০ সালে জনতা দলে যোগ দেন এবং ১৯৯০ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯৮ সালে মমতা ব্যানার্জি তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করলে তিনি সেই দলে যোগ দেন এবং দলটির প্রথম সাধারণ সম্পাদক হন। ২০০২ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে রাজ্যসভার সদস্য ছিলেন। পরে ২০০৯ সালে ব্যারাকপুর আসন থেকে লোকসভা নির্বাচনে জয়ী হয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর মমতা ব্যানার্জি রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়লে সেই দায়িত্ব পান দীনেশ ত্রিবেদী। তবে পরবর্তীতে তাকে ওই পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ব্যারাকপুর আসনে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হলেও বিজেপির অর্জুন সিংয়ের কাছে পরাজিত হন তিনি। এরপর তৃণমূল তাকে আবার রাজ্যসভায় পাঠায়। তবে কিছুদিনের মধ্যেই দলের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি তৃণমূল কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করেন এবং একই বছরের ৬ মার্চ বিজেপিতে যোগ দেন।
/এসএন