২০০২ সালের পর আবারও বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের স্বপ্ন দেখছে ব্রাজিল। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে বড় একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। জাতীয় দলের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিদেশি কোচ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ইতালিয়ান কিংবদন্তি কার্লো আনচেলত্তিকে। ফলে ফুটবল বিশ্বে এখন বড় প্রশ্ন—আনচেলত্তির নেতৃত্বে কি আবারও বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে ফিরতে পারবে সেলেসাওরা?
বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ব্রাজিলের পথচলা মোটেও স্বস্তিদায়ক ছিল না। টানা তিনজন ম্যানেজার পরিবর্তন এবং একাধিক হতাশাজনক ফলাফলের পর কনমেবল অঞ্চলের বাছাইপর্বে পঞ্চম স্থানে থেকে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করে দলটি। যদিও দলসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে তাদের বিশ্বকাপ মিস করার আশঙ্কা ছিল না, তবুও ১৮ ম্যাচে ৬ পরাজয় এবং রক্ষণভাগের দুর্বলতা সমর্থকদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার সরাসরি বিশ্বকাপ নিশ্চিত করা ছয় দলের মধ্যে কেবল কলম্বিয়াই ব্রাজিলের চেয়ে বেশি গোল হজম করেছে।
তবে ইতিহাস ব্রাজিলকে নতুন করে আশাবাদী করছে। ২০০২ সালে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের আগে একই ধরনের কঠিন বাছাইপর্ব পার করেছিল দলটি। সেবার আর্জেন্টিনা ও ইকুয়েডরের পেছনে তৃতীয় স্থানে থেকে বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত করলেও শেষ পর্যন্ত শিরোপা জিতে নেয় সেলেসাওরা। তাই ২৪ বছর পর সেই ইতিহাস পুনরাবৃত্তি হবে কি না, তা নিয়েই চলছে আলোচনা।
বিশ্বকাপের অন্যতম দাবিদার হিসেবে ব্রাজিলকে বিবেচনা করা হলেও তারা এবার একক ফেভারিট নয়। গ্রুপ পর্বে মরক্কো, স্কটল্যান্ড ও হাইতির বিপক্ষে খেলবে দলটি। তুলনামূলক সহজ এই গ্রুপ থেকে পরের রাউন্ডে ওঠা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হওয়ার কথা নয়। তবে ইউরোপের শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করতে হবে নকআউট পর্বে।
দলের আক্রমণভাগে সবচেয়ে বড় ভরসা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও রাফিনহা। ক্লাব ফুটবলে তারা দুর্দান্ত ছন্দে থাকলেও জাতীয় দলের জার্সিতে সেই ধারাবাহিকতা সবসময় দেখা যায়নি। বিশ্বকাপে দলের সাফল্যের জন্য তাদের বড় অবদান প্রয়োজন হবে।
অন্যদিকে ব্রাজিলের অন্যতম দুর্বলতা এখন ফুল-ব্যাক পজিশন। একসময় কাফু, রবার্তো কার্লোস, দানি আলভেস কিংবা মার্সেলোর মতো কিংবদন্তিদের দেখা মিললেও বর্তমানে সেই মানের খেলোয়াড়ের অভাব রয়েছে। ফলে অভিজ্ঞ দানিলো ও অ্যালেক্স সান্দ্রোকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিতে হতে পারে।
নেইমারের বিশ্বকাপ ভবিষ্যৎ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন ছিল। ঘনঘন চোট, বয়সের চাপ এবং ক্লাব পর্যায়ে অনিয়মিত পারফরম্যান্সের কারণে অনেকেই মনে করেছিলেন তার বিশ্বকাপ অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে। তবে এস্তেভাও ও রদ্রিগোর ইনজুরির সুযোগে শেষ মুহূর্তে চূড়ান্ত দলে জায়গা পেয়েছেন তিনি। ফিটনেসজনিত কারণে গ্রুপ পর্বের শুরুতে না খেললেও ৩৪ বছর বয়সী এই তারকা বিশ্বমঞ্চে প্রভাব রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
কার্লো আনচেলত্তি বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে সফল কোচদের একজন। এসি মিলান, রিয়াল মাদ্রিদ, বায়ার্ন মিউনিখ, প্যারিস সেন্ট জার্মেই ও চেলসির মতো ক্লাবের হয়ে অসংখ্য বড় শিরোপা জিতেছেন তিনি।
দীর্ঘ আলোচনার পর ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে তার সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন। এর মধ্য দিয়ে তিনি ব্রাজিল জাতীয় দলের ইতিহাসে প্রথম বিদেশি কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেন। তার অধীনে ব্রাজিল বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত করলেও দলের খেলায় ধারাবাহিকতার অভাব নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। প্রীতি ম্যাচ ও প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ মিলিয়ে কয়েকটি হতাশাজনক ফলও দেখতে হয়েছে তাকে।
গত মার্চে ফ্রান্সের বিপক্ষে পরাজয় ব্রাজিল ও ইউরোপীয় পরাশক্তিদের মধ্যে বর্তমান ব্যবধানকে সামনে নিয়ে আসে। ফলে বিশ্বকাপের শেষ ধাপে যেতে চাইলে ব্রাজিলকে এখনো বেশ কিছু জায়গায় উন্নতি করতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
১৩ জুন: ব্রাজিল বনাম মরক্কো — নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়াম
১৯ জুন: ব্রাজিল বনাম হাইতি — ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়াম
২৪ জুন: স্কটল্যান্ড বনাম ব্রাজিল — মায়ামি স্টেডিয়াম
২০২২ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বিদায় নেয় ব্রাজিল। গ্রুপ পর্বে সার্বিয়া ও সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে এবং ক্যামেরুনের কাছে হেরে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয় তারা। শেষ ষোলোতে দক্ষিণ কোরিয়াকে ৪-১ গোলে হারালেও কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে ৪-২ ব্যবধানে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যায়।
১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপে অংশ নেয় ব্রাজিল। দক্ষিণ আমেরিকার সাত দলের একটি হিসেবে অংশ নিলেও যুগোস্লাভিয়ার কাছে ২-১ গোলে হেরে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়। তবে প্রেগুইনহো দুই ম্যাচে তিন গোল করে আলোচনায় আসেন এবং ব্রাজিলের ইতিহাসে বিশ্বকাপের প্রথম গোলদাতার কৃতিত্ব অর্জন করেন।
ব্রাজিলের বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা রোনালদো নাজারিও। চারটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে তিনি ১৫ গোল করেন। ২০০২ সালের ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে তার দুই গোলেই শিরোপা জেতে ব্রাজিল। ২০০৬ সালে ঘানার বিপক্ষে করা গোলটি ছিল তার শেষ বিশ্বকাপ গোল।
১৯৫০ সালের ৯ জুলাই মারাকানা স্টেডিয়ামে সুইডেনকে ৭-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপে নিজেদের সবচেয়ে বড় জয় পায় ব্রাজিল। সেই ম্যাচে আদেমির ডি মেনেজেস একাই চার গোল করেন। যদিও পরে উরুগুয়ের কাছে হেরে শিরোপা হারাতে হয় স্বাগতিকদের। ইতিহাসে যা ‘মারাকানাজো’ নামে পরিচিত।
গোলকিপার: আলিসন, এদেরসন, ওয়েভারতন
ডিফেন্ডার: আলেক্স সান্দ্রো, ব্রেমার, দানিলো, ডগলাস সান্তোস, গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েস, ইবানিয়েজ, লেও পেরেইরা, মার্কিনিয়োস
মিডফিল্ডার: ব্রুনো গিমারায়েস, কাসেমিরো, দানিলো সান্তোস, ফাবিনিও, লুকাস পাকেতা, এডারসন
ফরোয়ার্ড: এন্দ্রিক, গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলি, ইগর থিয়াগো, লুইজ হেনরিকে, মাতেউস কুনিয়া, নেইমার জুনিয়র, রাফিনিয়া, রায়ান ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়র।
/এসএন