দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত এবং এস আলম গ্রুপের অপকর্মে সহযোগিতাকারী বলে দাবি করা একজন ব্যক্তিকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ইসলামী ব্যাংক কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের অর্থনীতি মারাত্মক সংকটে পড়বে। একই সঙ্গে জোরপূর্বক যাদের কাছ থেকে ব্যাংকটির শেয়ার নেওয়া হয়েছিল, তা প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
মঙ্গলবার (৯ জুন) জাতীয় সংসদে সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যেরও জবাব দেন।
শেয়ারহোল্ডারদের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে ড. শফিকুর রহমান বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন কীভাবে তারা শেয়ারহোল্ডার হয়েছেন, তা পরে দেখা হবে। কিন্তু এটি পরে নয়, আগেই স্পষ্ট হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার দাবি, এস আলম নিজের নামেই ইসলামী ব্যাংক থেকে ৮২ হাজার কোটি টাকা নিয়েছেন। আর যে শেয়ার কিনে তিনি ৮২ শতাংশ মালিকানা অর্জন করেছেন, তার মূল্য ছিল মাত্র ১২ হাজার কোটি টাকা।
তিনি বলেন, “তিনি শুধু কইয়ের তেল দিয়ে কই ভাজেননি, শোল মাছও ভেজেছেন। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নেওয়া অর্থ দিয়ে তিনি শেয়ার কিনেছেন। একটি বিশেষ সংস্থার মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ করে দীর্ঘদিনের প্রকৃত শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ার হস্তান্তরে বাধ্য করা হয়েছিল। এভাবেই ব্যাংকটিকে দেউলিয়া করা হয়েছে।”
ব্যাংকের নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারীদের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, প্রায় ১০ হাজার কর্মচারীকে কোনো নিয়মনীতি অনুসরণ না করে, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই এবং পরীক্ষা ছাড়া নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ৫ আগস্টের পর তাদের নিয়মতান্ত্রিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলেও তারা কেউ পরীক্ষায় অংশ নেননি বলে দাবি করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ড. শফিকুর রহমান বলেন, “তিনি ৭০০ কোটি টাকার ঋণ কোনো রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী তহবিলে যাওয়ার কথা বলেছেন। যদি এর দ্বারা জামায়াতে ইসলামীকে বোঝানো হয়ে থাকে, তাহলে আমি চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করছি। এটি প্রমাণ করতে পারলে আমি ব্যক্তিগতভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে একটি মেডেল দেব।”
তিনি আরও বলেন, কারও ছেলে, নাতি বা আত্মীয় পরিচয় বিবেচনা না করে কেউ যদি চুরি, ডাকাতি বা অসততার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করে থাকে, তাহলে তার বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। “আমি শফিকুর রহমান হলেও আমাকে যেন ছাড় দেওয়া না হয়,” বলেন তিনি।
ইসলামী ব্যাংক দখল প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারাকাতের বক্তব্যের ভিত্তিতে দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর ব্যাংকটিতে দুঃশাসন চালানো হয়েছে। তবে এ সময়ে কোনো অভিযোগের প্রমাণ দেওয়া হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, অনুমাননির্ভর বক্তব্য সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে উপস্থাপন করা উচিত নয়। তিনি আরডিএস প্রকল্পের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, এটি কোনো দল বা ধর্মের প্রকল্প নয়। এখানে সব ধর্ম ও শ্রেণির মানুষ সুবিধা পেয়েছেন।
নিজেকে ইসলামী ব্যাংকের একজন শেয়ারহোল্ডার ও গ্রাহক হিসেবে পরিচয় দিয়ে তিনি বলেন, “আমার ১০ টাকা মূল্যের একটি শেয়ার আছে। আমি আমার এই শেয়ারের অধিকার কখনো ছাড়ব না। রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়, একজন মালিক ও গ্রাহক হিসেবে আমি আমার অধিকার রক্ষায় যা করণীয় তা করব।”
তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংক কোনো একক ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর ব্যাংক নয়। এখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী এবং বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অ্যাকাউন্ট রয়েছে।
ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যানের সমালোচনা করে ড. শফিকুর রহমান দাবি করেন, এস আলমকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে শেখ হাসিনা ইসলামী ব্যাংককে ধ্বংস করেছেন এবং বর্তমান চেয়ারম্যানের নিয়োগ সেই ধারাবাহিকতারই প্রমাণ। তিনি অভিযোগ করেন, চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অতীতে অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে দায়িত্ব পালনকালে তিনি এস আলমের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করেছিলেন।
ইসলামী ব্যাংকের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, “ইসলামী ব্যাংক আস্থার একটি পিরামিড। এই পিরামিড যদি হেলে পড়ে বা ধসে যায়, তাহলে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হবে।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, যাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক শেয়ার নেওয়া হয়েছিল, তাদের কাছে আগের মূল্যে শেয়ার ফিরিয়ে দেওয়া উচিত। এরপর সরকার নিয়ম মেনে পরিচালনা পর্ষদ গঠন ও ব্যাংক পরিচালনা করলে তাদের পূর্ণ সমর্থন থাকবে।
ড. শফিকুর রহমান আরও বলেন, “যদি আবার অসৎ লোকদের হাতে ব্যাংকের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়, তাহলে যা কিছু অবশিষ্ট আছে তাও শেষ হয়ে যাবে। আমাদের উদ্বেগ এখানেই।”
তিনি দাবি করেন, অতীতে মাত্র চার দিনে ৭০ হাজার কোটি টাকা গ্রাহকরা উত্তোলন করেছিলেন। তখন ধৈর্য ধরার আহ্বান জানানো হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কী বলা উচিত, তা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
শেষে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “কোনো পূর্বধারণা থেকে নয়, বাস্তবতা বিবেচনা করে ইসলামী ব্যাংককে বাঁচাতে হবে। ব্যাংকটি আগের অবস্থানে ফিরতে পারলে পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর মানুষের আস্থা ফিরে আসবে। ইতোমধ্যে পাঁচটি ব্যাংকের গ্রাহকরা আমানত ফেরত না পেয়ে পথে পথে ঘুরছেন। দেশের সর্ববৃহৎ ব্যাংকটিরও যদি একই পরিণতি হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। আমরা চাই ব্যাংকটি বেঁচে থাকুক।”
/এসএন