মাসের শুরুতে হাতে পর্যাপ্ত অর্থ থাকলেও অনেকেরই কয়েকদিন যেতে না যেতেই টাকার টান পড়ে যায়। বিশেষ করে মাসের শেষভাগে খরচ সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। নিয়মিত আয় থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত ব্যয়, অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা এবং সঠিক পরিকল্পনার অভাবে সঞ্চয় করা কঠিন হয়ে ওঠে।
তবে অর্থ বিশেষজ্ঞদের মতে, দৈনন্দিন জীবনের কিছু ছোট পরিবর্তন এবং সঠিক আর্থিক পরিকল্পনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব। বড় কোনো পদক্ষেপ নয়, বরং ধারাবাহিক ছোট ছোট উদ্যোগই দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।
ফোর্বস ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে টাকা সঞ্চয়ের কয়েকটি কার্যকর উপায় তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা, ব্যয়ের নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত অভ্যাসের সমন্বয়ই সঞ্চয়কে স্থায়ী অভ্যাসে পরিণত করতে পারে।
সঞ্চয় শুরু করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো একটি স্পষ্ট লক্ষ্য ঠিক করা। লক্ষ্য যত পরিষ্কার হবে, তা অর্জন করাও তত সহজ হবে।
ধরুন, আপনি এক হাজার ডলার সঞ্চয় করতে চান। সে ক্ষেত্রে পুরো লক্ষ্যকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা রাখার পরিকল্পনা করতে পারেন। বড় অঙ্ককে ছোট ধাপে ভাগ করলে মানসিক চাপ কমে এবং ধারাবাহিকভাবে সঞ্চয় করা সহজ হয়।
অনেক সময় মাসিক খরচের বড় অংশ চলে যায় ফোন বিল, ইন্টারনেট, বীমা কিংবা বিভিন্ন অনলাইন সাবস্ক্রিপশনে। অনেক সেবা আমরা ব্যবহার না করলেও নিয়মিত অর্থ পরিশোধ করে যাই।
নিজের ব্যাংক স্টেটমেন্ট পর্যালোচনা করে কোন কোন সাবস্ক্রিপশন প্রয়োজন নেই তা চিহ্নিত করা যেতে পারে। ভিডিও স্ট্রিমিং সেবা, খাবার ডেলিভারি মেম্বারশিপ, ফিটনেস সাবস্ক্রিপশন কিংবা ম্যাগাজিনের মতো খাতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো সম্ভব।
এ ছাড়া প্রয়োজনীয় সেবাগুলোর ক্ষেত্রেও বছরে অন্তত একবার প্ল্যান পরিবর্তন বা খরচ কমানোর সুযোগ আছে কি না তা যাচাই করা যেতে পারে।
খরচ সাধারণত দুই ধরনের—নির্দিষ্ট এবং পরিবর্তনশীল। খাবার, যাতায়াত, পোশাক কিংবা বাইরে খাওয়াদাওয়ার মতো ব্যয় পরিবর্তনশীল খরচের আওতায় পড়ে।
এসব ক্ষেত্রে ছোট কিছু পরিবর্তন বড় সঞ্চয় এনে দিতে পারে। যেমন অফিসে বা কর্মস্থলে বাইরে খাবার কেনার বদলে বাসা থেকে খাবার নিয়ে যাওয়া, ঘন ঘন রেস্টুরেন্টে না খেয়ে ঘরে খাবারের ব্যবস্থা করা কিংবা সাশ্রয়ী দোকান থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা।
মাসিক অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে আনলেও সঞ্চয়ের সুযোগ বাড়ে।
সঞ্চিত অর্থ রাখার জন্য এমন ব্যাংক হিসাব নির্বাচন করা উচিত যেখানে তুলনামূলক বেশি সুদ পাওয়া যায় এবং প্রয়োজনে সহজে টাকা উত্তোলন করা সম্ভব।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সুদের মাধ্যমে সঞ্চয়ের পরিমাণও বাড়তে থাকে। বর্তমানে অনেক অনলাইন ব্যাংক তুলনামূলক বেশি সুদের সুবিধা দিয়ে থাকে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত ফি নেওয়া হয় না।
সঞ্চয়কে নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করার অন্যতম সহজ উপায় হলো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করা।
বেতন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সঞ্চয় হিসাবে জমা হলে আলাদা করে মনে রাখার প্রয়োজন হয় না। এতে নিয়মিত সঞ্চয় নিশ্চিত হয় এবং অপ্রয়োজনীয় খরচের সুযোগও কমে যায়।
বোনাস, উপহার, কর ফেরত বা অন্য কোনো অতিরিক্ত আয় হলে তার একটি অংশ সঞ্চয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা উচিত।
এই ধরনের এককালীন আয় দ্রুত সঞ্চয়ের পরিমাণ বাড়াতে সাহায্য করে এবং ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবনে যেকোনো সময় হঠাৎ জরুরি খরচ বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এমন অবস্থায় পর্যাপ্ত সঞ্চয় থাকলে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয় না। তাই শুরুতে অন্তত একটি নির্দিষ্ট জরুরি তহবিল গড়ে তোলার পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপর ধীরে ধীরে কয়েক মাসের ব্যয়ের সমপরিমাণ অর্থ সঞ্চয় করে রাখা ভালো।
সঞ্চয় কোনো একদিনের কাজ নয়। বরং ছোট ছোট অভ্যাস, পরিকল্পিত ব্যয় এবং ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মাধ্যমেই আর্থিক স্থিতিশীলতা অর্জন করা সম্ভব। বড় লক্ষ্য নয়, নিয়মিত ও সচেতন প্রচেষ্টাই আপনাকে একটি নিরাপদ আর্থিক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে পারে।
/এসএন