• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০২:৫০ এএম


বিশ্বে ১২০ কোটির বেশি মানুষ ভুগছেন মানসিক সমস্যায়

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২৫ মে ২০২৬ ১১:৫৬ এএম

বিশ্বজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে বলে উঠে এসেছে নতুন এক আন্তর্জাতিক গবেষণায়। বিশ্বখ্যাত স্বাস্থ্যবিষয়ক বিজ্ঞান সাময়িকী দ্য ল্যানসেটে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমানে বিশ্বের ১২০ কোটিরও বেশি মানুষ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। গবেষকদের মতে, বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বিস্তৃত স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলোর অন্যতম হয়ে উঠেছে মানসিক রোগ।

গত ২১ মে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়, ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১২০ কোটি মানুষ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত ছিলেন। ১৯৯০ সালের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় ৯৫ শতাংশ বেশি। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার বা উদ্বেগজনিত সমস্যা এবং মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার বা গুরুতর বিষণ্নতা। এ দুটি সমস্যার হার যথাক্রমে ১৫৮ শতাংশ ও ১৩১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

গবেষণায় বিশ্বের সবচেয়ে সাধারণ ১২টি মানসিক রোগের তালিকাও প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার, মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার, ডিসথাইমিয়া, বাইপোলার ডিসঅর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া, অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার, কন্ডাক্ট ডিসঅর্ডার, এডিএইচডি, অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা, বুলিমিয়া নার্ভোসা, ইডিওপ্যাথিক ডেভেলপমেন্টাল ইন্টেলেকচুয়াল ডিজঅ্যাবিলিটি (আইডিআইডি) এবং অন্যান্য মানসিক রোগ।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বেশিরভাগ মানসিক রোগে নারীদের আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি। বিশেষ করে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, বাইপোলার ডিসঅর্ডার, অ্যানোরেক্সিয়া ও বুলিমিয়ায় নারীরা তুলনামূলক বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। অন্যদিকে এডিএইচডি, অটিজম ও কন্ডাক্ট ডিসঅর্ডারের মতো সমস্যাগুলো ছেলেদের মধ্যে বেশি দেখা যাচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি মানসিক চাপে রয়েছে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীরা। গবেষকরা বলছেন, এই বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগ, হতাশা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার প্রবণতা বাড়ছে।

বিশ্বের ২০৪টি দেশ ও অঞ্চল নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় আরও দেখা গেছে, উন্নত ও ধনী দেশগুলোতে মানসিক রোগের হার তুলনামূলক বেশি। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, নেদারল্যান্ডসে প্রতি লাখে ৩ হাজার ৫৫৫ জন মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত, যেখানে ভিয়েতনামে এ সংখ্যা ১ হাজার ৩০২ জন।

গবেষকরা মনে করছেন, মানসিক রোগ বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো সচেতনতা বৃদ্ধি। এখন মানুষ আগের তুলনায় মানসিক সমস্যার কথা বেশি খোলামেলাভাবে বলছেন এবং চিকিৎসাও নিচ্ছেন।

এছাড়া ওভার-ডায়াগনোসিস বা অতিরিক্ত রোগ নির্ণয়ের বিষয়টিও সামনে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ দুশ্চিন্তা, মন খারাপ বা আচরণগত পরিবর্তনকেও মানসিক রোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

ওষুধ কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক প্রভাব নিয়েও আলোচনা হয়েছে গবেষণায়। বলা হয়েছে, ইউরোপ ও আমেরিকায় অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। সমালোচকদের দাবি, লাভের উদ্দেশ্যে কিছু ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়কে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক জীবনযাপনও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শহুরে একাকীত্ব, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, প্রক্রিয়াজাত খাবার, ঘুমের অনিয়ম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের মানসিক সুস্থতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবকে উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, যারা দিনে তিন ঘণ্টার বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে, তাদের মধ্যে বিষণ্নতা ও উদ্বেগের ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়।

গবেষকরা মনে করছেন, মানসিক রোগ সত্যিই বাড়ছে। তবে জীবনের স্বাভাবিক কষ্ট, দুশ্চিন্তা বা সাময়িক মন খারাপকে অতিরিক্তভাবে রোগ হিসেবে দেখাও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই সচেতনতা ও বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছেন তারা।

সুস্থ মানসিক জীবন বজায় রাখতে স্ক্রিন ব্যবহারের সময় কমানো, নিয়মিত ব্যায়াম করা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

/এসএন