সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় বেতন কাঠামো বা পে-স্কেল বাস্তবায়নের পথে বড় অগ্রগতি এসেছে। আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল কার্যকর করার নীতিগত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
নতুন এই বেতন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে বলে হিসাব করা হয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতির চাপ ও বিশাল আর্থিক ব্যয় সামাল দিতে সরকার একসঙ্গে পুরো বাস্তবায়নের পথে না গিয়ে তিন ধাপে এটি কার্যকর করার কৌশল নিয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বর্ধিত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ কার্যকর করা হবে। এ জন্য আসন্ন বাজেটে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখার প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে বাজেট-সংক্রান্ত উচ্চপর্যায়ের ধারাবাহিক বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। টানা দুই দিনের ওই বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন পে-স্কেলের রূপরেখা, বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর আহরণের সামগ্রিক চিত্র প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপন করেন।
সব দিক পর্যালোচনার পর প্রধানমন্ত্রী নতুন বেতন কাঠামো চালুর বিষয়ে চূড়ান্ত সম্মতি দেন বলে জানা গেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘প্রধানমন্ত্রী আগামী ১ জুলাই থেকেই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। ফলে জুলাই থেকে সরকারি চাকরিজীবীরা নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন পাবেন, এ বিষয়ে এখন আর কোনো সংশয় নেই।’
তিনি আরও জানান, অর্থমন্ত্রীর আসন্ন বাজেট বক্তৃতার খসড়াতেও ধাপে ধাপে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অর্থ বিভাগ ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। এ কারণেই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী অর্থবছর থেকেই বর্ধিত মূল বেতনের অর্ধেক কার্যকর করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে বাকি ৫০ শতাংশ মূল বেতন কার্যকর হবে। আর তৃতীয় ধাপে বিভিন্ন ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা নতুন কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, তিন বছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ফলে বাজারে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হবে না। একই সঙ্গে সরকারের নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনাও সহজ হবে।
এর আগে সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের বেতন কমিশন গত ২১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।
বর্তমানে দেশে প্রায় ১৪ লাখ কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগীর বেতন-ভাতা বাবদ সরকারের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।
বেসামরিক প্রশাসন, জুডিশিয়াল সার্ভিস ও সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামো বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত সুপারিশ প্রণয়নের জন্য সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কমিশন ও কমিটির খসড়া অনুযায়ী, সরকারি চাকরির গ্রেড আগের মতো ২০টিই থাকছে। তবে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এই কাঠামো অনুমোদিত হলে গ্রেডভেদে সরকারি কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। পাশাপাশি সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত ১:৯.৪ থেকে কমিয়ে ১:৮-এ নামিয়ে আনার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।
উচ্চপর্যায়ের ওই বৈঠকে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এবং অর্থ সচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
/এসএন