• ঢাকা
  • শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ০২:৫২ এএম


ঢাকায় অ্যাপে অটোরিকশা–রিকশায় অন্য যাত্রীর সঙ্গে চলা যাবে, খরচ কমবে

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৫ মে ২০২৬ ১২:৫২ পিএম

ঢাকার যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা আজাদুল ইসলাম (ছদ্মনাম) প্রতিদিন কর্মস্থলে যেতে নানা ধরনের পরিবহন ব্যবহার করেন। যাত্রাবাড়ী থেকে বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা রিকশায় তিনি মতিঝিল পৌঁছান, সেখান থেকে মেট্রোরেলে কারওয়ান বাজারে যান। ফেরার সময়ও একইভাবে মেট্রোরেল ব্যবহার করে মতিঝিলে এসে আবার বাস, অটোরিকশা বা রিকশায় যাত্রাবাড়ী ফেরেন।

তবে তাঁর দৈনন্দিন যাতায়াতে রয়েছে নানা ভোগান্তি। বাসে অতিরিক্ত ভিড় ও পকেটমারের ঝুঁকি, আবার সিএনজিচালিত অটোরিকশায় অতিরিক্ত ভাড়ার চাপ। তুলনামূলকভাবে রিকশার ভাড়া কম হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেটিও বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আজাদুলের মনে হয়েছে, যদি অন্য যাত্রীর সঙ্গে ভাগাভাগি করে অটোরিকশা বা রিকশায় যাওয়া যেত, তাহলে ভাড়া কমানো সম্ভব হতো।

এই সমস্যার সমাধান দিতে এগিয়ে এসেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর তিন শিক্ষার্থী—জোবায়ের খান, মুস্তাকিম মোরসেদ ও আবুল বাসার। আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থীরা ‘জাইগো’ (JyGo) নামের একটি ভেহিকেল-পুলিং অ্যাপ তৈরি করেছেন।

তাঁদের মতে, একই সময়ে একই গন্তব্যে যাওয়া যাত্রীদের একটি প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করে এই অ্যাপ। এরপর ব্যবহারকারীরা ব্যক্তিগত গাড়ি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা রিকশায় একসঙ্গে ভ্রমণ করতে পারেন এবং ভাড়া ভাগাভাগি করতে পারেন।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কারওয়ান বাজার থেকে যাত্রাবাড়ী যেতে একটি অটোরিকশার ভাড়া যদি ৪০০ টাকা হয়, তাহলে ‘জাইগো’ অ্যাপ ব্যবহার করে তিনজন যাত্রী একসঙ্গে গেলে সেই ভাড়া তিনজনের মধ্যে ভাগ হয়ে যাবে। উদ্যোক্তাদের দাবি, এতে একজন যাত্রীর খরচ ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এ সেবা দিতে কোনো অতিরিক্ত কমিশনও নেওয়া হচ্ছে না।

অ্যাপটির সহ-উদ্যোক্তা জোবায়ের খান বলেন, এই উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু খরচ কমানো নয়, ঢাকার যানজটও কমানো। একই সংখ্যক যাত্রীর জন্য কমসংখ্যক যানবাহন ব্যবহার করা গেলে সড়কে চাপ কমবে এবং জ্বালানি সাশ্রয় হবে।

এই অ্যাপটি চলতি বছরের জানুয়ারিতে গুগল প্লে স্টোর ও হুয়াওয়ের অ্যাপ গ্যালারিতে চালু করা হয়। মাত্র তিন মাসেই ব্যবহারকারীর সংখ্যা সাড়ে সাত হাজার ছাড়িয়েছে এবং প্রতিদিনই নতুন ব্যবহারকারী যুক্ত হচ্ছেন। সম্প্রতি বৈশ্বিক স্টার্টআপ নেটওয়ার্ক ‘এফ৬এস’-এর শীর্ষ রাইড হেইলিং কোম্পানির তালিকায় ‘জাইগো’ চতুর্থ স্থান অর্জন করেছে।

বর্তমানে সেবাটি ঢাকাকেন্দ্রিক হলেও উদ্যোক্তারা এটি দেশের বাইরে নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। আগামী মাসে মালয়েশিয়ায় অ্যাপটির কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে ভারত ও শ্রীলঙ্কায়ও এটি সম্প্রসারণের চিন্তা করা হচ্ছে।

অ্যাপটি ব্যবহার করতে হলে গুগল প্লে স্টোর বা হুয়াওয়ের অ্যাপ গ্যালারি থেকে ডাউনলোড করে নাম ও মোবাইল নম্বর দিয়ে নিবন্ধন করতে হয়। এরপর ব্যবহারকারী নিয়মিত রুট বা তাৎক্ষণিক রুট নির্বাচন করে সহযাত্রী খুঁজে নিতে পারেন।

নিয়মিত রুটে চলাচলের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারী নিজের নির্দিষ্ট পথ নির্ধারণ করে রাখতে পারেন, ফলে একই পথে যাওয়া অন্য যাত্রীদের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংযুক্ত হওয়া যায়। আর তাৎক্ষণিক যাত্রার ক্ষেত্রে লাইভ লোকেশনের মাধ্যমে কাছাকাছি একই গন্তব্যের যাত্রীদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা হয়।

নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। এতে রয়েছে ব্যবহারকারী যাচাইকরণ, লাইভ লোকেশন ট্র্যাকিং এবং জরুরি কল সুবিধা। নারী যাত্রীদের জন্য আলাদা ‘জেন্ডার প্রেফারেন্স’ অপশন রাখা হয়েছে, যাতে তারা চাইলে শুধু নারী সহযাত্রীর সঙ্গে ভ্রমণ করতে পারেন।

তবে এই উদ্যোগের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখনো কম হওয়ায় অনেক সময় সহযাত্রী পেতে দেরি হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাইড অনুরোধের পর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, যা জরুরি সময়ে অসুবিধা তৈরি করতে পারে।

বুয়েটের আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক ইশরাত ইসলাম এই উদ্যোগকে সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ভাগাভাগি ভিত্তিক পরিবহনব্যবস্থা বিদেশে প্রচলিত থাকলেও ঢাকায় এটি তুলনামূলক নতুন ধারণা। একই এলাকার যাত্রীদের একত্রে সংযুক্ত করার এই মডেল সৃজনশীল উদ্যোগের পরিচয় দেয়, তবে নিরাপত্তার বিষয়টি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।