বিশ্ব বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের দীর্ঘদিনের আধিপত্য কমিয়ে নিজেদের মুদ্রা ইউয়ানের ব্যবহার বাড়াতে নতুন সাফল্য পেয়েছে চীন। এতদিন পর্যন্ত বৈশ্বিক খনিজ লোহার বাজার পুরোপুরি ডলারের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এবার সেখানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে বেইজিং।
বিশ্বের বৃহত্তম খনি কোম্পানি অস্ট্রেলিয়ার বিএইচপি-এর সঙ্গে প্রায় সাত মাস ধরে চলা জটিল বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে এই অগ্রগতি অর্জন করে চীন। এতদিন বিএইচপি চীনের কাছে যে পরিমাণ লৌহ আকরিক বিক্রি করত, তার সব লেনদেন হতো মার্কিন ডলারে। তবে নতুন চুক্তির আওতায় এখন থেকে এর একটি অংশ চীনা মুদ্রা ইউয়ানে পরিশোধ করা হবে।
এই পরিবর্তনকে চীনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই দেশটি আন্তর্জাতিক বাজারে নিজস্ব মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করে আসছিল, বিশেষ করে খনিজ সম্পদ আমদানির ক্ষেত্রে।
শুধু লোহা নয়, জ্বালানি তেলের বাজারেও ডলারের বিকল্প হিসেবে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়তে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইউয়ানে ঋণ নেওয়ার হারও রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। তুলনামূলকভাবে কম সুদের কারণে গোল্ডম্যান স্যাক্সের মতো শীর্ষ মার্কিন ব্যাংকগুলোও চীনের অফশোর ঋণবাজারের দিকে ঝুঁকছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যবসায় অনিশ্চয়তা এড়াতে অনেক বিনিয়োগকারী ও প্রতিষ্ঠান ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দিচ্ছে।
খনিজ বাজারে এই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে চীন সরকারের প্রতিষ্ঠিত ‘চায়না মিনারেল রিসোর্সেস গ্রুপ’ (সিএমআরজি)। এই সংস্থাটি চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য আকরিক লোহা আমদানির ক্ষেত্রে মূল সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করে।
বিএইচপি প্রথমদিকে সরাসরি চীনা ইস্পাত কারখানার সঙ্গে ডলারে চুক্তি করতে চাইলেও সিএমআরজি তাদের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে। একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটি বিএইচপি-এর জিম্বলবার আকরিক লোহা আমদানি নিষিদ্ধ করে দেয়।
এই অচলাবস্থা দূর করতে সম্প্রতি বিএইচপি-এর বিদায়ী প্রধান নির্বাহী মাইক হেনরি এবং নতুন প্রধান ব্র্যান্ডন ক্রেগ বেইজিংয়ে চীনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকের ফলাফল হিসেবে নতুন একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যেখানে বিএইচপি চীনের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি মেনে নেয় এবং কিছু ছাড় দিতে সম্মত হয়।
অস্ট্রেলিয়ার অন্যান্য বড় খনিজ কোম্পানি যেমন রিও টিন্টো ও ফোর্টেস্কু আগেই চীনের অভ্যন্তরীণ মূল্য সূচক অনুসরণ করে আসছিল। তবে বিএইচপি-এর মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের এই সিদ্ধান্ত বিশ্ব খনিজ বাজারে নতুন বার্তা দিয়েছে যে, এই খাতের নিয়ন্ত্রণে চীনের প্রভাব বেড়েছে।
এতদিন লৌহ আকরিকের দাম নির্ধারণে মার্কিন সংস্থা এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের ‘প্ল্যাটস ইনডেক্স’ সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করত। কিন্তু চীন তাদের নিজস্ব ‘বেইজিং আয়রন ওর পোর্ট স্পট প্রাইস ইনডেক্স’ চালুর দাবি দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছিল।
নতুন চুক্তির আওতায় বিএইচপি শুধু চীনের এই সূচক মেনে নেয়নি, বরং চীনের ইস্পাত কারখানাগুলোর জন্য অতিরিক্ত ১ দশমিক ৮ শতাংশ মূল্যছাড়ও দিয়েছে। চীনা সংবাদমাধ্যম কাইসিন জানিয়েছে, জিম্বলবার আকরিকের মূল্য নির্ধারণে এখন ৫১ শতাংশ ক্ষেত্রে ইউয়ান এবং বেইজিংয়ের মূল্য সূচক ব্যবহার করা হবে।
চীনের এই ধারাবাহিক অগ্রগতির ফলে ধারণা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে অন্যান্য খনিজ আমদানিতেও রেনমিনবিতে লেনদেন আরও বাড়বে।
/এসএন