দিনের ব্যস্ততা শেষে রাত নামলেই কুমিল্লার সড়ক-মহাসড়কে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডের মতো গুরুত্বপূর্ণ যাতায়াতকেন্দ্র থেকে রাতে বাড়ি ফেরা যাত্রীদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা। অপরিচিত চালকের সিএনজিচালিত অটোরিকশায় গন্তব্যে যাওয়ার নিরাপত্তা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। সম্প্রতি শিক্ষার্থী জান্নাতুত তাজমিনের হত্যাকাণ্ড এ উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড থেকে নগরীর রেসকোর্স এলাকার বাসায় ফেরার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় উঠেছিলেন জান্নাতুত তাজমিন। অভিযোগ রয়েছে, গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে চালক সুমন মিয়া তাঁকে নির্জন এলাকায় নিয়ে যান। পরে লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন।
এ ঘটনার পর রাতে গণপরিবহণ থেকে নেমে বাড়ি ফেরা নারী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে দূরপাল্লার বাসে কুমিল্লায় পৌঁছে গভীর রাতে নিজ গন্তব্যে যাওয়া যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবি স্থানীয়দের
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, শুধু গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে নয়, মহাসড়কের সংযোগ সড়ক ও নির্জন এলাকাগুলোতেও নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। রাতে যাত্রী ওঠানামার স্থানগুলোতে পুলিশের উপস্থিতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে নিয়মিত টহল চালানোর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
তাঁদের মতে, সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকদের পরিচয় ও যানবাহনের তথ্য সংরক্ষণ, অনিবন্ধিত যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন অপরাধ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি ছিনতাইসহ অন্যান্য অপরাধের অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার ব্যবস্থাও কার্যকর করা প্রয়োজন।
সচেতন নাগরিকেরা মনে করছেন, অপরাধ সংঘটনের পর অভিযান চালানোর পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো আগেই চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। পরিবহণকেন্দ্রগুলোতে নজরদারি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো গেলে রাতে যাতায়াতের ক্ষেত্রে মানুষের আস্থা ফিরতে পারে।
নয় মাসে জেলায় ১১১টি খুনের ঘটনা
কুমিল্লা জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে জেলায় ১১১টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। অপরাধসংক্রান্ত পরিসংখ্যানে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে কয়েক ধরনের অপরাধের মামলার সংখ্যাও বেড়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে হত্যার মামলা ছিল ১১টি। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬টিতে। একই সময়ে ডাকাতির মামলা দুটি থেকে বেড়ে তিনটি এবং চুরির মামলা ৩৫টি থেকে বেড়ে ৪৪টি হয়েছে। এ ছাড়া দস্যুতার পাঁচটি মামলা হয়েছে।
অপরাধের এসব পরিসংখ্যানের মধ্যে রাতের সড়কে যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে নারী ও শিক্ষার্থীদের নিরাপদে বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হচ্ছে।
টহল জোরদারের কথা জানিয়েছে পুলিশ
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রকিবুল ইসলাম বলেন, মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশ নিয়মিত কাজ করছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, রাতের সড়কে কার্যকর নজরদারি, নিয়মিত পুলিশি টহল এবং অপরাধের অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে যাত্রীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা হবে। বিশেষ করে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডসহ গুরুত্বপূর্ণ পরিবহণকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা গেলে গভীর রাতে বাড়ি ফেরা মানুষের উদ্বেগ কমতে পারে।
/এএসএফ