ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব। এ অভিযানে এক লাখের বেশি ইয়েমেনি সেনা মোতায়েন হতে পারে। স্থল ও বিমান হামলার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশের সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তায় সম্ভাব্য এই অভিযানের প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরব ইয়েমেনের উপকূলীয় এলাকায় অগ্রসর হয়ে হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভূখণ্ড পুনর্দখল এবং একই সময়ে একাধিক ফ্রন্টে হামলা চালানোর দুটি সম্ভাব্য পরিকল্পনা বিবেচনা করছে। এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দাবের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করা এবং হুতিদের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা।
অভিযানের প্রস্তুতির বিষয়ে অবগত ছয়জন আঞ্চলিক ও পশ্চিমা কর্মকর্তার বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অভিযান শুরু হতে পারে। তবে ঠিক কবে তা শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সামরিক প্রস্তুতি ও পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে সময়সূচি পরিবর্তিত হতে পারে।
সম্ভাব্য এই অভিযানে স্থলভাগের মূল দায়িত্ব থাকবে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীর ওপর। অভিযানের পরিসরের ওপর নির্ভর করে এক লাখের বেশি ইয়েমেনি সেনা এতে অংশ নিতে পারে। রিয়াদের তত্ত্বাবধানে তারা হুতিদের অবস্থানের দিকে অগ্রসর হবে এবং সৌদি যুদ্ধবিমান আকাশপথ থেকে তাদের সহায়তা করতে পারে।
সৌদি আরব দুটি সম্ভাব্য পরিকল্পনা বিবেচনা করছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এর একটি হলো বাব আল-মান্দাবের আশপাশে সীমিত পরিসরে অভিযান। অন্যটি হলো আল-বাইদা, মারিব, তাইজ ও আল-জাওফসহ ইয়েমেনের একাধিক এলাকায় একই সময়ে হামলা চালিয়ে বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করা।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য ও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে সহায়তা করছে। তবে মার্কিন সেনারা সরাসরি ইয়েমেনে স্থলযুদ্ধে অংশ নেবে—এমন কোনো পরিকল্পনার কথা জানা যায়নি। একইভাবে সৌদি মিত্রদেরও সরাসরি যুদ্ধাভিযানে অংশ নেওয়ার পরিবর্তে মূলত প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তুরস্ক ও পাকিস্তান সৌদি আরবকে সামরিক সরঞ্জাম ও পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করছে। ফ্রান্সও প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা দেওয়ার পাশাপাশি সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর সুরক্ষায় সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, পাকিস্তান সৌদি আরবের সীমান্ত প্রতিরক্ষা এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কাজে সহায়তার জন্য ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার সেনা মোতায়েন করেছে। পাকিস্তানি কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব সেনা ধাপে ধাপে গত বছর থেকে এবং সাম্প্রতিক উত্তেজনা বাড়ার পর সৌদিতে পৌঁছেছে।
পাশাপাশি গত মাসে পাকিস্তান এডেনে চারটি কার্গো বিমান পাঠিয়েছে। এসব বিমানে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, হালকা কামান, ড্রোন ও ড্রোন প্রতিরোধী সরঞ্জাম ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত বাহিনীকে সহায়তায় পাকিস্তানি সামরিক পরামর্শকরাও কাজ করছেন বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সৌদি আরবের আগে কেনা তুরস্কের তৈরি ড্রোনও ইয়েমেনের আকাশে নজরদারির কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে হুতিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে সুরক্ষিত রাখাও রিয়াদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ হয়ে উঠেছে।
২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির পর ইয়েমেনে কয়েক বছর তুলনামূলকভাবে সংঘাত কম থাকলেও চলতি বছর পরিস্থিতির আবার অবনতি হয়েছে। হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে তাদের হামলার পর নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বেড়েছে।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য নতুন অভিযানের অন্যতম কারণ হলো ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে তাদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি এবং বাব আল-মান্দাবের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। এই নৌপথটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জাহাজ চলাচলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে, সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে রাজনৈতিকভাবে হুতিদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার জানিয়েছেন, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে গঠিত প্রতিরক্ষা জোটের সদস্যরা আগামী সপ্তাহে রিয়াদে বৈঠকে বসবেন। সেখানে ইরানের পক্ষ থেকে হুতিদের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে যোগাযোগের যে পরামর্শ এসেছে, সেটিও আলোচনায় থাকতে পারে।
এর মধ্যেই ইয়েমেনে নতুন করে বিমান হামলা ও সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারের বাহিনী তাইজ প্রদেশে হুতিদের লক্ষ্য করে একাধিক বিমান হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে।
সম্ভাব্য সৌদি অভিযান বাস্তবে শুরু হলে এর পরিসর কতটা হবে এবং তা ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে কী প্রভাব ফেলবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে এক লাখের বেশি ইয়েমেনি সেনা নিয়ে বড় ধরনের অভিযান এবং বাব আল-মান্দাবকে ঘিরে সামরিক তৎপরতা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও লোহিত সাগরের নৌ চলাচলের ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স
/এএসএফ