সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণের ঘটনায় উত্তর কোরিয়াকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়া। তবে সিউলের সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে পিয়ংইয়ং। এর মধ্যেই শনিবার (৩ অক্টোবর) ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে নিজেদের অবস্থান জানিয়ে দিয়েছে উত্তর কোরিয়া।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার উত্তর কোরিয়ার পূর্ব উপকূলীয় ওনসান এলাকা থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রটি ৭০০ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়েছে বলে জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী।
সীমান্তের অসামরিকীকৃত অঞ্চল বা ডিএমজেডে মাইন বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার তিন সেনা আহত হওয়ার ঘটনায় পিয়ংইয়ংয়ের দায় অস্বীকার এবং সিউলের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যেই নতুন করে এই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হলো।
গত মাসে দুই কোরিয়ার সীমান্তবর্তী ডিএমজেডের ভেতরে ওই বিস্ফোরণ ঘটে। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী এবং যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘ কমান্ডের তদন্তে বলা হয়েছে, সীমান্তের দক্ষিণ পাশে উত্তর কোরিয়ার পুঁতে রাখা মাইনের কারণেই বিস্ফোরণটি ঘটেছে। তবে পিয়ংইয়ং এ ঘটনায় নিজেদের দায় অস্বীকার করেছে।
শনিবার ভোরে উত্তর কোরিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় ওনসান এলাকা থেকে ক্ষেপণাস্ত্রটি উৎক্ষেপণ করা হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ (জেসিএস) এক বিবৃতিতে জানায়, ক্ষেপণাস্ত্রটি পূর্ব সাগরের দিকে ছোড়া হয়েছে। এই জলভাগ জাপান সাগর নামেও পরিচিত।
এদিকে, উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের বিষয়ে দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান ঘনিষ্ঠভাবে তথ্য বিনিময় করছে এবং প্রতিরক্ষার জন্য সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সিউলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রটি ৭০০ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়েছে। তবে ক্ষেপণাস্ত্রটির সুনির্দিষ্ট ধরন ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য এখনো বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
১৯৫৩ সালের যুদ্ধবিরতির পর থেকেই দুই কোরিয়ার মধ্যে বিভাজন তৈরি করে রেখেছে ডিমিলিটারাইজড জোন বা অসামরিকীকৃত অঞ্চল (ডিএমজেড)। প্রায় চার কিলোমিটার প্রশস্ত এই সীমান্তবর্তী এলাকায় বিপুলসংখ্যক স্থলমাইন পুঁতে রাখা হয়েছে।
গত ২১ সেপ্টেম্বর ডিএমজেডে টহলের একটি পথ পরিষ্কারের সময় মাইন বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার তিন সেনা আহত হন। তাদের মধ্যে দুজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী ও যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘ কমান্ডের যৌথ তদন্তে বিস্ফোরণের জন্য উত্তর কোরিয়ার পুঁতে রাখা মাইনকে দায়ী করা হয়েছে। সিউলের দাবি, সীমান্তের দক্ষিণ পাশে উত্তর কোরিয়ার সেনাদের পুঁতে রাখা মাইনের কারণেই বিস্ফোরণ ঘটে।
এ ঘটনাকে ১৯৫৩ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে উত্তর কোরিয়ার কাছে ক্ষমা চেয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। পাশাপাশি সীমান্তে মাইন পোঁতা এবং প্রতিরক্ষা অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে দেশটি।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাং শিন-চুলের ভাষ্য অনুযায়ী, বিস্ফোরণের জন্য দায়ী মাইনগুলো উত্তর কোরিয়ার সীমান্ত সুরক্ষা জোরদারের কাজের অংশ হিসেবে পোঁতা হয়ে থাকতে পারে।
২০২৪ সালে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন দক্ষিণ কোরিয়াকে তার দেশের ‘প্রধান শত্রু’ হিসেবে ঘোষণা করার পর থেকে সীমান্ত পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ নেয় পিয়ংইয়ং। এর অংশ হিসেবে উত্তর কোরিয়ার সেনারা সীমান্ত এলাকায় মাইন পুঁতেছে এবং ট্যাংক চলাচল ঠেকাতে প্রতিবন্ধক নির্মাণ করেছে।
তবে মাইন বিস্ফোরণের ঘটনায় নিজেদের দায় অস্বীকার করেছে উত্তর কোরিয়া। শুক্রবার (২ অক্টোবর) দেশটির নেতা কিম জং উনের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং দক্ষিণ কোরিয়াকে ‘ঘৃণ্য’ বলে আখ্যা দেন। একই সঙ্গে মাইন বিস্ফোরণের সঙ্গে পিয়ংইয়ংয়ের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ কোরিয়ার কূটনৈতিক উদ্যোগের জবাবে শক্তি প্রদর্শনের অংশ হিসেবেই উত্তর কোরিয়া এই ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এর মাধ্যমে সিউলের সঙ্গে আলোচনায় বসার প্রস্তাব কার্যত প্রত্যাখ্যান করেছে পিয়ংইয়ং।
সিউলের সাবেক ইউনিভার্সিটি অব নর্থ কোরিয়ান স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট ইয়াং মু-জিন এএফপিকে বলেন, সিউল উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে, কিন্তু পিয়ংইয়ং এর জবাবে উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে।
তিনি আরও বলেন, শুভেচ্ছার জবাবে উত্তর কোরিয়া যে সংঘাতের পথ বেছে নিচ্ছে, এই বার্তাই দেওয়া হচ্ছে।
/এসএন