হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধের পর এবার লোহিত সাগরের দক্ষিণাঞ্চলীয় বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানিতেও নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের জ্বালানি বিপর্যয় ও মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
ইরান-সমর্থিত হুতি সশস্ত্র গোষ্ঠীর ধারাবাহিক হামলা ও অবরোধের জেরে মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় ১২ শতাংশ তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক হামলা ও সামুদ্রিক অবরোধের মুখে লোহিত সাগর দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়েছে। নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অপরিশোধিত তেলবাহী সুপারট্যাঙ্কারগুলো অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (এআইএস) বা ট্র্যাকিং সংকেত পুরোপুরি বন্ধ রেখে চলাচল শুরু করেছে।
লোহিত সাগর দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করে সৌদি আরব। ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে বিরোধের জেরে সম্প্রতি দেশটির রপ্তানি খাতে ধাক্কা লেগেছে। তেলনির্ভর অর্থনীতির কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখতে কৌশলে এই বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে দেশটি।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের প্রধান তেল টার্মিনাল ‘ইয়ানবু’ থেকে সম্পূর্ণ গোপনে বা ‘ডার্ক ভয়েজ’-এর মাধ্যমে তেল ওঠানো-নামানো হচ্ছে।
চলতি বছর বিশ্বজুড়ে দৈনিক তেল সরবরাহ ৪৩ লাখ ব্যারেল বা প্রায় ৪ শতাংশ কমতে পারে বলে সতর্ক করেছে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ)।
আইইএর সর্বশেষ মাসিক তেল বাজারবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে নির্বিঘ্নে জাহাজ চলাচলের বিষয়ে এখনো কোনো সমঝোতা হয়নি। এ কারণে বছরের বাকি সময়ের জন্য বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহের পূর্বাভাস আরও কমিয়েছে সংস্থাটি।
নতুন পূর্বাভাস অনুযায়ী, দৈনিক তেল সরবরাহের ঘাটতি ৪৩ লাখ ব্যারেলে দাঁড়াতে পারে। গত জুলাইয়ের প্রতিবেদনে আইইএ ৩৭ লাখ ব্যারেল ঘাটতির পূর্বাভাস দিয়েছিল। অর্থাৎ, এক মাসের ব্যবধানে ঘাটতির পূর্বাভাস আরও ৬ লাখ ব্যারেল বেড়েছে।
এর ফলে চলতি বছরে বিশ্বে মোট দৈনিক তেল সরবরাহ প্রায় ১০ কোটি ২০ লাখ ২০ হাজার ব্যারেলে (১০২ দশমিক ০২ মিলিয়ন) নেমে আসতে পারে। এটি চলতি বছরের জন্য আইইএর করা সর্বনিম্ন সরবরাহের পূর্বাভাস।
সংস্থাটি বলছে, চলমান যুদ্ধ এবং এর কারণে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলে বাধার ফলে বিশ্ব তেলবাজারে সরবরাহ ঘাটতির ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
গত ২০ জুলাই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নতুন সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণা দেয় হুতি গোষ্ঠী। এরপর থেকে সৌদি-সংশ্লিষ্ট একাধিক ট্যাঙ্কার, ইয়ানবুর অবকাঠামো এবং সর্বশেষ লোহিত সাগর উপকূলীয় জাজান তেল শোধনাগারে হামলার দায় স্বীকার করে সশস্ত্র দলটি।
ধারাবাহিক এই হুমকির পর তেলবাহী জাহাজগুলো প্রকাশ্যে দৃশ্যমান জিপিএস ট্র্যাকিং বন্ধ করে দেয়। ফলে বিশ্ববাজারে সৌদি আরবের তেল সরবরাহের সঠিক পরিমাণ পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ভর্টেক্সা, কেপলার ও অ্যাক্সমেরিনের মতো শীর্ষস্থানীয় জাহাজ-ট্র্যাকিং সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক তথ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে বড় ধরনের অসঙ্গতি দেখা গেছে। কেপলারের মতে, লোহিত সাগরের পশ্চিম উপকূলে পরিবাহিত মোট তেলের প্রায় ৭০ শতাংশই বর্তমানে নিরবচ্ছিন্ন এআইএস সংযোগ ছাড়া পরিবাহিত হচ্ছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভারত বা এশিয়ার দিকে বাব আল-মান্দেব প্রণালি ব্যবহারের ঝুঁকি এড়াতে বিকল্প উত্তর রুটে ঝুঁকছেন বিশ্বস্ত ট্যাঙ্কার অপারেটররা। লোহিত সাগর থেকে সরাসরি উত্তরে সুয়েজ খাল কিংবা মিশরের ‘সুমেড’ পাইপলাইনের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরে পৌঁছে সিদি কেরির টার্মিনাল হয়ে ইউরোপ ও বৈশ্বিক বাজারে তেল রপ্তানি বাড়ানো হচ্ছে।
গত সপ্তাহে সিদি কেরির থেকে রেকর্ড দৈনিক ২ দশমিক ১৭ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল খালাস করা হয়েছে। এর ৯০ শতাংশই ছিল সৌদি আরবের। আন্তর্জাতিক যুদ্ধ ঝুঁকি বীমা ও সুপারট্যাঙ্কার পরিচালনার খরচ হু হু করে বাড়লেও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, হরমুজ প্রণালির পর বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতি ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতি চরম ঝুঁকিতে পড়বে। এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
/এএসএফ