• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:০০ পিএম


লোডশেডিং সামলাতে শিল্পের গ্যাস কমিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রে বরাদ্দ, শিল্পকারখানার উৎপাদন বন্ধ হবার আশঙ্কা!

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১৩ আগস্ট ২০২৬ ৭:২৯ এএম

সারা দেশে এমনিতেই তীব্র গরম। কিছুটা স্বস্তির আশায় ফ্যানের নিচে যাওয়ার সুযোগও পাচ্ছেন না মানুষ। লোডশেডিং এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে, কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। এতে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে মানুষ। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার রাজধানীতেও এক-দুই ঘণ্টা লোডশেডিং দেওয়ার চিন্তা করছে। ঢাকার বাইরে টানা লোডশেডিংয়ে নাশকতার আশঙ্কাও করছে সরকার। এজন্য দেশের সব জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গ্যাসের সরবরাহ দিন দিন খারাপ হচ্ছে। লোডশেডিংয়ে বিক্ষুব্ধ মানুষকে শান্ত করতে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। দিনে ২০-৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস বরাদ্দ কমানো হয়েছে শিল্প খাতে। ফলে সারা দেশের শিল্প খাতে সংকট আরও তীব্র হয়েছে। গ্যাসের চাপ না থাকায় সারা দেশে ৩-৪ হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদনে বিপর্যয় নেমে এসেছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অনেক কারখানা ২-৩ ঘণ্টাও চালু রাখা যাচ্ছে না।

তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ বুধবার যুগান্তরকে বলেন, বিভিন্ন এলাকার অসংখ্য শিল্পকারখানা গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ করেছে। তিতাস যে বরাদ্দ পেয়েছে, সে অনুযায়ী বিদ্যুৎ ও শিল্পকারখানাকে গ্যাস দেওয়া হয়েছে।

বুধবার জ্বালানি খাতের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, আগে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস যাবে। এরপর অন্য খাতে। এ সময় তিনি জ্বালানি খাতের কোনো কোনো কর্মকর্তা সরকারের বিরুদ্ধে নাশকতা করছেন বলেও অভিযোগ তোলেন। বলেন, তাদের কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ঠিকমতো গ্যাস পাচ্ছে না।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বুধবার সাংবাদিকদের বলেছেন, শিগগির পরিস্থিতির উন্নতি হবে। সরকার এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছে।

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, টানা বৃষ্টি ছাড়া আপাতত পরিস্থিতির বড় ধরনের পরিবর্তনের সুযোগ কম। বলা হচ্ছে, বৈরী আবহাওয়ায় সৌদি আরামকোর এলএনজিবাহী কার্গো সামিটের ভাসমান টার্মিনালের সঙ্গে সংযুক্ত করা যায়নি। অন্যদিকে একটি মাত্র বয়লার দিয়ে আংশিক এলএনজি সরবরাহ চালু রেখেছে এক্সিলারেট এনার্জি। এ কারণে বুধবার এই দুই টার্মিনাল থেকে এলএনজি সরবরাহ আরও কমেছে।

গত মঙ্গলবারও এই দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে দিনে ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। গতকাল জাতীয় গ্রিডে গেছে ৪৮ কোটি ঘনফুট। কবে নাগাদ এ টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বাড়বে, তা বলা যাচ্ছে না।

**লোডশেডিং ভোগান্তিতে চিন্তিত সরকার**

শিল্পকারখানার উৎপাদন কমিয়ে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রও চালু করা হচ্ছে। তবুও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। অনেক এলাকায় রাতের বেশির ভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না।

বিদ্যুৎ বিভাগ, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবি এবং পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড-আরইবির কর্মকর্তারা যুগান্তরকে বলেছেন, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের শীর্ষ মহল থেকে শুরু করে সবাই চিন্তিত। মহলবিশেষ নাশকতার সুযোগ নিতে পারে বলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো রিপোর্ট দিচ্ছে।

এতে বলা হচ্ছে, ময়মনসিংহ বিভাগের কোনো কোনো এলাকায় ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। চট্টগ্রাম ও খুলনায় ৭ ঘণ্টার বেশি এবং কুমিল্লায় ৬ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং হচ্ছে।

জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক যুগান্তরকে বলেছেন, এলাকায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা ৬০ ভাগের বেশি। ময়মনসিংহ-১ সমিতির মহাব্যবস্থাপক জোনাব আলী যুগান্তরকে বলেছেন, ৫০ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

এমন অবস্থায় বুধবার সকালে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এবং বিকালে দেশের সব জেলা প্রশাসকের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন বিদ্যুৎ সচিব। তিনি সার্বিক পরিস্থিতি জেনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদকে অবগত করেন।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিতরণ কোম্পানির সিনিয়র কর্মকর্তারা কয়েকদিন ধরে সরকারের নীতিনির্ধারকদের জানিয়ে আসছেন যে, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি একেবারেই ভালো নয়। বিশেষ করে ময়মনসিংহ এলাকা, নাটোর, নেত্রকোনাসহ বেশ কয়েকটি জেলার পরিস্থিতি হতাশাজনক। এ কারণে অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও কর্মসূচি দেওয়া হচ্ছে স্থানীয়ভাবে। কিন্তু রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে তা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

নেত্রকোনার বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তারা বিদ্যুৎ সচিবকে বুধবার জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি নাজুক। কোনো কোনো এলাকায় ৭৯ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। এমনকি ১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও ৬ মেগাওয়াটও পাওয়া যাচ্ছে না। রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে বিদ্যুৎ অফিসকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা চলছে।

নাটোরের বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের বক্তব্যও একই। এলাকায় ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে কোথাও টানা একাধিক দিন লোডশেডিং না করে একেক দিন একেক এলাকায় লোডশেডিং করা যায় কিনা, তা খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। রাজধানীর আশপাশেও লোডশেডিং করার সিদ্ধান্ত হতে পারে।

গতকাল দুপুর ৩টায় সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ২৩৭ মেগাওয়াট। সরবরাহ করা হয়েছে ১৩ হাজার ৮৫৫ মেগাওয়াট। লোডশেডিং হয়েছে ৩ হাজার ৩৮২ মেগাওয়াট।

**সব কেন্দ্রে সর্বোচ্চ উৎপাদনের নির্দেশ**

বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে গতকাল থেকে সৈয়দপুর এবং খুলনার ডিজেলচালিত দুই কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। গ্যাসের বরাদ্দও বেড়েছে। তাই গতকাল ৭০০ মেগাওয়াটের মেঘনাঘাট বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করা হয়েছে। তবে যান্ত্রিক কারণে বন্ধ হয়ে গেছে চাঁদপুর এবং সিলেটের একটি করে ইউনিট।

পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, এখনো পিডিবি বরাদ্দের সব গ্যাস (৯০ কোটি ঘনফুট) ব্যবহার করেনি। গ্যাসভিত্তিক মেশিনগুলো (বিদ্যুৎকেন্দ্র) আস্তে আস্তে চালু করা হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, ৯০ কোটি ঘনফুট গ্যাস বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার হলে বিদ্যুতের ঘাটতি কিছুটা কমে আসবে।

দেশে যথাসম্ভব সব বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে।

**এবার লোডশেডিংয়ের ভিকটিম দেশের শিল্প খাত**

বুধবার থেকে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে বিদ্যুৎ খাতে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতদিন বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হতো ৭০ কোটি ঘনফুটের কম। সেখানে বুধবার থেকে বরাদ্দ বাড়িয়ে করা হয়েছে ৯০ কোটি ঘনফুট। তবে সন্ধ্যা ৭টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভাগ সেই গ্যাস নিতে পারেনি।

তিতাস, বাখরাবাদ এবং কর্ণফুলীর কর্মকর্তারা জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস দিতে গিয়ে দেশের শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

তিতাসের একজন কর্মকর্তা জানান, শুধু তিতাস এলাকায় সাড়ে চার হাজারের মতো শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে। এর মধ্যে বুধবার ৩ হাজারের বেশি গ্যাসের কারণে পুরোদমে উৎপাদন করতে পারেনি। এই পরিস্থিতি আজ আরও খারাপ হতে পারে। কারণ সামিটের এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো যাচ্ছে না।

গতকাল বুধবার সারা দেশে গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হয়েছে ২০৯ কোটি ঘনফুটের মতো। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে ৮৮ থেকে ৯০ কোটি ঘনফুট, শিল্প খাতে ৮০ কোটি ঘনফুট, সার খাতে ১৪ কোটি এবং অন্যান্য খাতে ২৬ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হয়েছে। আগে শিল্প খাতে ১০০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হতো।

সূত্র: যুগান্তর

/এএসএফ