• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০৪ পিএম


বোমার শব্দের মধ্যেও থামেনি স্বপ্ন, তাঁবুতে বসেই অনলাইনে পরীক্ষা দিচ্ছে গাজার শিক্ষার্থীরা

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২৭ জুন ২০২৬ ১০:২০ পিএম

দখলদার ইসরায়েলের টানা হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজার অসংখ্য স্কুল-কলেজ। লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে আশ্রয় নিয়েছে অস্থায়ী তাঁবুতে। তবুও থেমে নেই শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের লড়াই। যুদ্ধ, অনিশ্চয়তা ও সীমাহীন কষ্টের মাঝেও অনলাইনে তাওজিহি (মাধ্যমিক সমাপনী) পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে তারা।

তেমনই একজন শিক্ষার্থী ডানা। তার বিশ্বাস, এই পরীক্ষার ফলই নির্ধারণ করবে তার ভবিষ্যৎ। বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান, ফিন্যান্স কিংবা বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন—কোন বিষয়ে পড়বে, তা এখনো ঠিক করেনি। তবে ভালো ফল করে বিদেশে বৃত্তি নিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা থেকে বেরিয়ে নতুন জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখছে সে।

ইসরায়েলের দীর্ঘ সামরিক অভিযানের নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে ডানা। গত বছরের মে মাসে এক হামলায় প্রাণে বেঁচে গেলেও তার মা লিনা নিহত হন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে প্রাণ হারানো ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনির একজন ছিলেন তিনি।

উত্তর গাজার বেইত হানুনে বেড়ে ওঠা ডানার পরিবার এখন মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকায় একটি তাঁবুতে বসবাস করছে। নিজ এলাকা প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তাদের বাস্তুচ্যুত হতে হয়েছে।

গাজার অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যাওয়া বা আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হওয়ায় ডানাসহ অসংখ্য শিক্ষার্থী দূরশিক্ষণের মাধ্যমে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথম পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে তাওজিহি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে পশ্চিম তীরে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে পরীক্ষা দিলেও গাজার শিক্ষার্থীদের পুরোপুরি অনলাইনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

প্রতিদিন ভোর হওয়ার আগেই বাবা মুহান্নার সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টা হেঁটে এমন একটি ক্যাফেতে পৌঁছায় ডানা, যেখানে তুলনামূলক ভালো ইন্টারনেট সংযোগ পাওয়া যায়। সেখানেই মোবাইল ফোন ব্যবহার করে পরীক্ষায় অংশ নেয় সে।

ডানা বলে, “আমি কখনো ভাবিনি আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টা এভাবে কাটবে। তিন বছরের পড়াশোনা হারিয়েছি। প্রতিটি বিষয় আমাকে নিজে নিজেই শিখতে হয়েছে। এখন পরীক্ষা দেওয়াটাও মানসিক চাপের আরেকটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

ডানার বাবা মুহান্না যুদ্ধের আগে একজন রসায়নের শিক্ষক ছিলেন। তিনি জানান, মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে নিজের সামর্থ্যের সবটুকুই ব্যয় করেছেন। সংসারের অন্যান্য প্রয়োজন কমিয়ে প্রাইভেট টিউটরের ব্যবস্থা করেছেন, যাতে ডানা কঠিন বিষয়গুলো বুঝতে পারে।

তিনি বলেন, “আমাদের জীবন একসময় খুব সুন্দর ছিল। নিজের বাড়ি ছিল, স্থিতিশীলতা ছিল। এখন আমরা একটি তাঁবুতে বাস করছি। এমন পরিস্থিতিতে সন্তানদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা দিতে হচ্ছে।”

মায়ের মৃত্যুর পর বড় বোন হালার সঙ্গে তিন ছোট বোন—রামা, সারা ও আলমার দেখাশোনার দায়িত্বও কাঁধে তুলে নিয়েছে ডানা। মাত্র তিন বছর বয়সী আলমা সেই হামলায় একটি চোখ হারিয়েছে, যে হামলায় তাদের মা নিহত হয়েছিলেন।

পরীক্ষা শেষে ক্যাফে থেকে বেরিয়ে বাবাকে ডানা জানায়, পরীক্ষা ভালো হয়েছে এবং এবার ইন্টারনেট সংযোগও স্থিতিশীল ছিল। এরপর বিশ্রাম না নিয়ে পরবর্তী পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য নিজের ও বাবার মোবাইল ফোন চার্জে দেয়, কারণ বিদ্যুতের সংকট তাদের নিত্যদিনের বাস্তবতা।

সব প্রতিকূলতার মধ্যেও ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী ডানা। সে একজন কমিউনিটি লিডার হতে চায়, নতুন ভাষা শিখতে চায় এবং নিজের কর্মজীবনে সফল হতে চায়।

ডানার ভাষায়, “আমি আশা করি তাঁবুর এই কষ্ট একদিন শেষ হবে। আমি সেই সফল মানুষটি হতে চাই, যাকে আমার মা সবসময় দেখতে চেয়েছিলেন।”

সূত্র: আল-জাজিরা

/এএসএফ