গাজা উপত্যকা ও পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি শিশুদের ওপর ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ও নিরাপত্তা বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন। কমিশনের মতে, এসব কর্মকাণ্ড গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধের শামিল হতে পারে।মঙ্গলবার (২৩ জুন) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ফিলিস্তিনি শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তদন্ত করেছে জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজা যুদ্ধে নিহতদের প্রায় ৩০ শতাংশই শিশু। কমিশনের তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত অন্তত ২০ হাজার ১৭৯ জন ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে।এর আগে গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত একই কমিশনের আরেক প্রতিবেদনে গাজায় গণহত্যা সংঘটনের জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করা হয়েছিল। সেই প্রতিবেদনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বানিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এসব কর্মকাণ্ডে উসকানি দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়। তবে ইসরায়েল শুরু থেকেই এসব অভিযোগকে ‘কেলেঙ্কারিপূর্ণ’ বলে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ চলাকালে এবং ২০২৫ সালের অক্টোবরে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পরও ফিলিস্তিনি শিশুদের লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত ছিল। কমিশনের মতে, এটি গাজায় ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যের অভিযোগকে সমর্থনকারী গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
কমিশনের চেয়ারম্যান শ্রীনিবাসন মুরলিধর এক বিবৃতিতে বলেন, “প্রমাণগুলো দেখায় যে ফিলিস্তিনি শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে এবং হত্যা করা হয়েছে।”প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, অতীতের গাজা সংঘাতগুলোর তুলনায় এবারের যুদ্ধে শিশু নিহতের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ২০০৮-০৯ এবং ২০১৪ সালের গাজা যুদ্ধে নিহতদের মধ্যে শিশুদের হার ছিল প্রায় ২৪ শতাংশ। বর্তমান সংঘাতে সেই হার বেড়ে ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে।কমিশনের অভিযোগ, বিপুলসংখ্যক শিশুর প্রাণহানি সত্ত্বেও ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বোমা ও ব্যাপক ধ্বংসক্ষম অস্ত্রের ব্যবহার অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েলি বাহিনী।
তদন্তকারীদের মতে, এতে হামলাগুলোর ইচ্ছাকৃত চরিত্রের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলি বাহিনী সামগ্রিক বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে হামাস বা অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে বিবেচনা করায় শিশুদেরও সমষ্টিগতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।তবে জেনেভায় ইসরায়েলের মিশন এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, সংঘাত চলাকালেও শিশুদের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার জন্য ইসরায়েল ধারাবাহিকভাবে পদক্ষেপ নিয়েছে। শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগও তারা কঠোর ভাষায় নাকচ করেছে।প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গাজায় ইসরায়েলের আরোপিত অবরোধ, বারবার বাস্তুচ্যুতি, খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহে বাধা এবং ব্যাপক সামরিক হামলার কারণে শিশুদের শারীরিক স্বাস্থ্য ও মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এর ফলে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু এবং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক আঘাতের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে।জাতিসংঘের তদন্তে দেখা গেছে, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রজননস্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে হামলার কারণে নবজাতকদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কমে গেছে এবং গর্ভপাতের ঘটনাও বেড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজার প্রায় সব শিশুরই বর্তমানে মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা প্রয়োজন।অন্যদিকে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনি শিশুদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তে গণগ্রেপ্তার ও আটক অভিযানের সময় নির্যাতন, যৌন সহিংসতা এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার প্রমাণও পাওয়া গেছে।কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশেষ করে ফিলিস্তিনি কিশোরদের জোরপূর্বক কাপড় খুলতে বাধ্য করা, মারধর করা এবং খাবার থেকে বঞ্চিত করার মতো আচরণ করা হয়েছে, যা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।তবে ইসরায়েল দাবি করেছে, পশ্চিম তীর সংক্রান্ত প্রতিবেদনে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকাণ্ডের পেছনে থাকা সন্ত্রাসী হুমকির প্রেক্ষাপট ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
/বিএসএস