আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যক্তি শ্রেণির আয়কর কাঠামোয় বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে বলে মন্তব্য করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, নতুন কর কাঠামোয় তুলনামূলক কম আয়ের মানুষের ওপর করের চাপ বেশি বাড়ছে, অথচ উচ্চ আয়ের করদাতাদের ক্ষেত্রে করদায় বৃদ্ধির হার অনেক কম।
রোববার রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে আয়োজিত বাজেট পর্যালোচনা বিষয়ক এক সংলাপে এসব মন্তব্য তুলে ধরে সিপিডি।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আখতার হোসেন।
এ ছাড়া আলোচনায় অংশ নেন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, র্যাপিড চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ, বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান এবং গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষ।
মূল প্রবন্ধে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, যাদের বার্ষিক করযোগ্য আয় ৬ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকার মধ্যে, নতুন বাজেটে তাদের করদায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। অন্যদিকে, বছরে ৩০ লাখ টাকার বেশি আয় করা করদাতাদের করের দায় বাড়বে মাত্র ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। তার মতে, এই পরিস্থিতি সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে ১৮ মাসে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, প্রস্তাবিত বাজেটে তার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি। শ্রম, প্রবাসী কল্যাণ, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ হয় কমেছে, নয়তো স্থবির রয়েছে। পাশাপাশি পটুয়াখালী ইপিজেড ও জামদানি ভিলেজের মতো কর্মসংস্থানমুখী গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, সুনির্দিষ্ট জাতীয় কর্মসংস্থান কর্মসূচি এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার ছাড়া বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য বাস্তবায়ন কঠিন হবে। এ ধরনের লক্ষ্য কেবল রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা হিসেবেই থেকে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বাজেটের সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, রাজস্ব আদায়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং কার্যকর মুদ্রানীতি গ্রহণ অপরিহার্য।
ড. ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহায়তা কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সরকারকে একটি চ্যালেঞ্জিং বাজেট প্রণয়ন করতে হয়েছে। তাই ঋণনির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প অর্থায়নের উৎস খুঁজছে সরকার।
তিনি বলেন, ‘বাজেট নিখুঁত হয়েছে—এ কথা বলছি না। যেদিকেই হাত দিই, শুধু বকেয়া। এমন পরিস্থিতিতে দেড় মাসের মধ্যে বাজেট প্রস্তুত করতে হয়েছে, অথচ একটি পূর্ণাঙ্গ বাজেট তৈরির জন্য অন্তত ছয় মাস সময় প্রয়োজন।’
ফ্যামিলি কার্ড প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রকৃত উপকারভোগীদের মধ্যে সঠিকভাবে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ নিশ্চিত করা হবে। এতে নিম্ন আয়ের মানুষের কিছুটা হলেও স্বস্তি মিলবে।
সূত্র: সিপিডি বাজেট সংলাপ
/এএসএফ