গল্পটি যেন হলিউডের কোনো চিত্রনাট্য থেকে উঠে এসেছে। ফিলাডেলফিয়ার দুই কিশোর, যাদের নাম রোনান ও ডেকলান সুলিভান, বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-২০ দলে ট্রায়াল দিতে আসার আগে কখনো বাংলাদেশে পা রাখেননি। অথচ সেই দুই ভাইই এখন বাংলাদেশের হয়ে সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে দেশে ফিরেছেন। তাদের স্বপ্ন এখন আরও বড়—বাংলাদেশের হয়ে বিশ্বকাপ খেলা।সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটি গোলশূন্য থাকায় টাইব্রেকারে গড়ায়। বাংলাদেশের পঞ্চম ও জয়সূচক পেনাল্টি নিতে এগিয়ে যান রোনান। জীবনে মাত্র দুবার পানেনকা শট নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। তার একটি শট আবার ক্রসবারে লেগেছিল। তবুও জয়সূচক মুহূর্তে চিপ শট নেওয়ার সিদ্ধান্তে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি।রোনানের যমজ ভাই ডেকলানও আগে থেকেই জানতেন, ভাই কী করতে যাচ্ছেন। সেন্ট জোসেফ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডরমিটরিতে বসে সেই মুহূর্তের স্মৃতিচারণ করে ডেকলান বলেন, রোনানকে পঞ্চম পেনাল্টি নিতে দেওয়া হলে সে যে পানেনকাই নেবে, তা তিনি জানতেন।শেষ পর্যন্ত রোনানের নেওয়া চিপ শট নিখুঁতভাবে জালে জড়িয়ে যায়। গত ৩ এপ্রিল মালদ্বীপের মালের স্টেডিয়ামে হাজারো দর্শক উল্লাসে ফেটে পড়েন। বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-২০ দল জিতে নেয় সাফের শিরোপা।রোনানের ভাষায়, পরিস্থিতির শেষটা এমন হবে—এ কথা কেউ আগে বললে তিনি বিশ্বাসই করতেন না।সুলিভান ভাইদের বাংলাদেশের হয়ে খেলার গল্পের শুরু হয়েছিল আরও অবিশ্বাস্যভাবে। ‘সেভ বাংলাদেশ ফুটবল’ নামের একটি ফ্যান পেজের ইনস্টাগ্রাম বার্তার মাধ্যমে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে সেই যোগাযোগ গড়ায় আন্তর্জাতিক ট্রফি জয়ের আনন্দে।মালদ্বীপে একা উড়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও রোনানের কাছে ছিল বিশেষ। সেখানকার নীল পানি তাকে মুগ্ধ করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির ওশান সিটির পানির সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, মালদ্বীপের পানির রং এতটাই সুন্দর যে তা তাঁর কাছে সিনেমার দৃশ্যের মতো মনে হয়েছিল।রোনান ও ডেকলানের নাম এখন বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র এবং দেশের বাইরেও পরিচিত। তাদের এই যাত্রা বাংলাদেশের ফুটবলে প্রবাসী ও বিদেশে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রতিভাদের যুক্ত করার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।ডেকলান মনে করেন, তাদের অভিজ্ঞতা অন্য অনেক তরুণ ফুটবলারকেও বাংলাদেশের হয়ে খেলার ব্যাপারে উৎসাহিত করেছে। ইংল্যান্ডের ভালো মানের একাডেমিতে খেলা কয়েকজন কিশোর ফুটবলারও বাংলাদেশের হয়ে খেলার আগ্রহ দেখাচ্ছেন বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি প্রতিভাগুলোকে এখন কাজে লাগানোর সময় এসেছে।সুলিভান পরিবারের ফুটবল প্রতিভার অবশ্য আরও বড় পরিসর রয়েছে। রোনান ও ডেকলানের পাশাপাশি তাদের দুই ভাই কোয়েন ও ক্যাভানও ফুটবলার। দুজনই ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের আক্রমণভাগের খেলোয়াড়। কোয়েন গত গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দলে জায়গা করে নিয়েছেন। আর ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দেওয়ার অপেক্ষায় থাকা ক্যাভানকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম উদীয়মান ফুটবল প্রতিভা হিসেবে দেখা হচ্ছে।বাংলাদেশের হয়ে খেলার সুযোগ তৈরির গল্পটি শুরুতে রোনান ও ডেকলানের কাছেও অবিশ্বাস্য ছিল। ‘সেভ বাংলাদেশ ফুটবল’ অ্যাকাউন্ট থেকে পাওয়া বার্তায় প্রথমে তারা কিছুটা বিভ্রান্ত হয়েছিলেন। পরে জানতে পারেন, এটি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের অনুমোদিত একটি মাধ্যম। এরপর সাফ অনূর্ধ্ব-২০ টুর্নামেন্টে খেলার আগ্রহ জানালে তাদের সঙ্গে বাফুফের সহসভাপতি ফাহাদ করিমের যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হয়।কলেজ শুরুর আগে কিছুটা সময় হাতে থাকায় বাংলাদেশে এসে খেলার সিদ্ধান্ত নেন তারা। তবে তাদের মায়ের বাংলাদেশি পাসপোর্ট না থাকায় নাগরিকত্ব ও যোগ্যতার বিষয়টি নিশ্চিত করতে প্রক্রিয়াটি সহজ ছিল না। শেষ পর্যন্ত মার্চে নিউইয়র্ক থেকে দিল্লি হয়ে ঢাকায় আসেন দুই ভাই। সেটিই ছিল তাদের জীবনের দীর্ঘতম সফর।ঢাকায় পৌঁছানোর পর অবশ্য তাদের জন্য কোনো বিশেষ সংবর্ধনা ছিল না। ৩০ জনের বেশি খেলোয়াড় নিয়ে শুরু হওয়া ক্যাম্পে তাদেরও অন্যদের মতোই জায়গা করে নিতে হয়েছে। চূড়ান্ত দলে সুযোগ পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তাও ছিল না।দলের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভাষাও ছিল একটি বাধা। রোনান বলেন, বিদেশ থেকে আসা খেলোয়াড়দের শুরুতে বল পাওয়া কঠিন হতে পারে, কারণ ভাষা বোঝা যায় না এবং সতীর্থরা শুরুতে তাদের আগমনকে ইতিবাচকভাবে নাও নিতে পারেন। তবে কয়েকবার বল পেয়ে নিজের দক্ষতা দেখাতে পারলে পরিস্থিতি বদলে যায়।সুলিভান ভাইদের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জাতীয় দলের নতুন প্রধান কোচ থমাস ডুলির পরিকল্পনার সঙ্গেও মিলে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ডুলি দীর্ঘদিন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কোচিং করেছেন। তাঁর বিশ্বাস, বাংলাদেশকে শুধু ফুটবল সমর্থকদের দেশ হিসেবে থাকলে হবে না; ফুটবল খেলার দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।ডুলি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের জাতীয় দলে খেলার সুযোগ দেওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থাকা খেলোয়াড়দের সঙ্গে খেললে দেশের তরুণ ফুটবলাররা তাদের মানসিকতা, কাজের প্রতি নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্ব থেকে শেখার সুযোগ পাবে।লেস্টার সিটির মিডফিল্ডার হামজা চৌধুরীর উদাহরণও তিনি সামনে আনেন। ডুলির মতে, হামজার বাংলাদেশ দলে আগমন খেলোয়াড়দের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করেছে।বিদেশে থাকা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের খোঁজ করতে গিয়ে আরও প্রতিভার সন্ধান পাচ্ছেন ডুলি। তবে তিনি সতর্কও। তাঁর কাছে প্রতিটি বিদেশি খেলোয়াড়কে দলে নেওয়ার চেয়ে সত্যিকারের মানসম্পন্ন খেলোয়াড় খুঁজে বের করাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাজেট সীমিত। এমন কোনো খেলোয়াড়ের পেছনে অর্থ ব্যয় করতে চান না, যিনি জাতীয় দলে এসে বেঞ্চেই বসে থাকবেন।ডুলি মনে করেন, একটি সম্ভাবনাময় দলকে কঠোর পরিশ্রম করানো এবং খেলা সম্পর্কে তাদের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আনতে পারলে দলের সামগ্রিক মান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। তাঁর বিশ্বাস, ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ১৫০-এর ঘরে ওঠা বাংলাদেশের জন্য অর্জনযোগ্য লক্ষ্য।সুলিভান ভাইদের জনপ্রিয়তাও সাফ জয়ের পর দ্রুত বেড়ে যায়। চার ভাইয়ের ইনস্টাগ্রাম পোস্টের মন্তব্যের ঘরে বহু বছর ধরেই বাংলাদেশি পতাকার স্টিকার দেখা যায়। তবে সাফের ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে জয়ের পর সেই আগ্রহ যেন অন্য মাত্রা পায়।রোনান জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে নানা ধরনের ভিডিও ও ছবি তৈরি করা হচ্ছিল। ভারত-বাংলাদেশের ফুটবল প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ঘিরে অনলাইনে উত্তেজনাও ছিল তীব্র।মালদ্বীপে সমর্থকদের উন্মাদনা এবং এরপর ঢাকায় সংবর্ধনা—দুই অভিজ্ঞতাই সুলিভান ভাইদের কাছে ছিল অভূতপূর্ব। ডেকলান বলেন, দেশে ফিরে তারা অনেক ফুল পেয়েছেন, অসংখ্য মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে এবং সাফের ট্রফি নিয়ে ফেরায় সবাই ভীষণ খুশি ছিল।বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে ডুলির স্বপ্নও এখন বড়। তিনি মনে করেন, জাতীয় দলের সাফল্য বাড়লে মানুষের আগ্রহ, পৃষ্ঠপোষকতা ও বিনিয়োগও বাড়বে। এর মাধ্যমে যুব একাডেমি থেকে খেলোয়াড় উঠে এসে পেশাদার লিগে খেলার একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি হতে পারে।জাতীয় দলের সামনে এখন বড় লক্ষ্য নভেম্বরে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিতব্য সিনিয়র সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। বাংলাদেশ ২০০৩ সালে একবারই এই প্রতিযোগিতার শিরোপা জিতেছে। ডুলির কাছে সেটিই এখন প্রধান লক্ষ্য। তবে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আরও বিস্তৃত—বাংলাদেশের ফুটবলের সংস্কৃতি, অবকাঠামো ও মানসিকতায় পরিবর্তন আনা।এরই মধ্যে সম্ভাব্য নতুন খেলোয়াড়দের নিয়েও কাজ করছেন তিনি। ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়ন একাডেমির সাবেক খেলোয়াড় নেহান হাসান, পেন স্টেটের উইঙ্গার এবং স্ট্যানফোর্ডের স্ট্রাইকার ট্রেভর ইসলামের মতো খেলোয়াড়দের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন ডেকলান। ডুলি আবার ফুলহাম একাডেমির ১৯ বছর বয়সী উইঙ্গার ফারহান ওয়াহিদ এবং ইংল্যান্ডের চতুর্থ স্তরের লিগে খেলা ২৫ বছর বয়সী অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার লুই ওয়াটসনের কথাও ভাবছেন।ডুলি মনে করেন, যোগ্য খেলোয়াড়দের বাংলাদেশি ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত করতে তাদের বোঝাতে হবে যে, তারা চাইলে এই দেশের ফুটবলে নিজেদের একটি স্থায়ী উত্তরাধিকার রেখে যেতে পারেন।সবচেয়ে বড় স্বপ্ন অবশ্য বিশ্বকাপ। পুরুষদের বিশ্বকাপে এখনো দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশ খেলতে পারেনি। বাংলাদেশের জন্য সেই পথ কঠিন হলেও সুলিভান ভাইদের বিশ্বাস, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রতিভাদের একত্র করা গেলে সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে।ডেকলানের ভাষায়, বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করাই তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। আর রোনানের বিশ্বাস, বাংলাদেশ যদি সত্যিই বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পারে, তাহলে পুরো দেশ যেন বিস্ফোরিত হয়ে আনন্দ উদযাপন করবে।ডুলির স্বপ্নও একই জায়গায় গিয়ে মেলে। তিনি চান, বাংলাদেশের শিশুরা শুধু আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের সমর্থক হবে না; বরং একদিন নিজেদের জাতীয় দলের খেলোয়াড় হতে চাইবে এবং আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের মতো দলের বিপক্ষে মাঠে নামার স্বপ্ন দেখবে। সুলিভান ভাইদের গল্প হয়তো সেই স্বপ্নেরই প্রথম দিকের একটি বাস্তব উদাহরণ।
/বিএসএস