• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৮:১৬ এএম


সীমান্ত রক্ষায় নিয়োজিতদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ, যা বলছে কোরআন-হাদিস

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১৩ জুন ২০২৬ ৮:৩১ পিএম

ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী দেশ, সমাজ ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু নাগরিক দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবেও বিবেচিত। যারা মানুষের জীবন, সম্পদ, স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সতর্ক প্রহরীর দায়িত্ব পালন করেন, তাদের জন্য কোরআন ও হাদিসে বিশেষ মর্যাদা ও বিপুল প্রতিদানের ঘোষণা রয়েছে।

ইসলামী পরিভাষায় সীমান্ত বা জনপদে শত্রুর অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে সতর্ক অবস্থানে থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বকে বলা হয় ‘রিবাত’। কোরআন ও হাদিসে এই আমলের এমন ফজিলত বর্ণিত হয়েছে, যা অনেক নফল ইবাদতের চেয়েও অধিক মর্যাদাপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

কোরআনে সীমান্ত পাহারার নির্দেশ

মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, ধৈর্যে অটল থাকো, সীমান্তে ও প্রহরায় নিয়োজিত থাকো এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।” (সুরা আল-ইমরান : ২০০)

তাফসিরবিদদের মতে, এই আয়াতে মুসলিম সমাজ ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বদা সতর্ক ও প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ‘রাবিতু’ শব্দটি সীমান্ত পাহারা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বের প্রতি ইঙ্গিত বহন করে।

এক দিনের প্রহরা দুনিয়ার সব সম্পদের চেয়েও মূল্যবান

সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আল্লাহর পথে এক দিন সীমান্ত পাহারা দেওয়া দুনিয়া ও এর ওপর যা কিছু আছে তার চেয়েও উত্তম।” (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৮৯২)

এই হাদিসে সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বের এমন মর্যাদা তুলে ধরা হয়েছে, যা দুনিয়ার সম্পদ, ক্ষমতা ও ভোগ-বিলাসের সঙ্গেও তুলনাতীত।

এক দিন-এক রাতের প্রহরা এক মাসের ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ

সালমান ফারসি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আল্লাহর পথে এক দিন ও এক রাত সীমান্ত পাহারা দেওয়া এক মাস রোজা রাখা এবং এক মাস রাতভর ইবাদত করার চেয়েও উত্তম।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯১৩)

এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন অনেক সময় দীর্ঘ সময়ের নফল ইবাদতের চেয়েও বেশি সওয়াবের কারণ হতে পারে।

মৃত্যুর পরও চলতে থাকে প্রতিদান

একই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, “যদি এ অবস্থায় তার মৃত্যু হয়, তবে তার আমলের সওয়াব অব্যাহত থাকবে, তার জন্য রিজিক প্রবাহিত হতে থাকবে এবং সে কবরের পরীক্ষার ভয় থেকে নিরাপদ থাকবে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯১৩)

সাধারণত মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে আমলের ধারাবাহিকতা শেষ হয়ে যায়। কিন্তু সীমান্ত পাহারা ও নিরাপত্তা রক্ষার মতো জনকল্যাণমূলক দায়িত্ব পালনের প্রতিদান মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে বলে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে।

যে রাত কদরের রাতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, “আমি কি তোমাদের এমন এক রাতের কথা বলব না, যা কদরের রাতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ? সে হলো ওই প্রহরীর রাত, যে ভয়সংকুল স্থানে পাহারা দেয় এবং আশঙ্কা করে যে হয়তো সে তার পরিবারের কাছে জীবিত ফিরে যেতে পারবে না।” (আল মুসতাদরাক আলা আসসহিহাইন, হাদিস : ২৪২৪; তারগিব ওয়াত তারহিব : ১২৩২)

এই হাদিসে দায়িত্ব পালনের সময় প্রহরীদের আত্মত্যাগ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানের উচ্চ মর্যাদা তুলে ধরা হয়েছে।

যে চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না

সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “দুটি চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না—এক. যে চোখ আল্লাহর ভয়ে অশ্রু ঝরায়; দুই. যে চোখ আল্লাহর পথে রাত জেগে পাহারা দেয়।” (তিরমিজি, হাদিস : ১৬৩৯)

এই হাদিসে নিরাপত্তা ও সীমান্ত রক্ষায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে।

এক রাতের প্রহরায় জান্নাতের সুসংবাদ

হুনাইনের যুদ্ধের রাতে সাহাবি আনাস ইবনে আবু মারসাদ আল-গানাবি (রা.) একটি গুরুত্বপূর্ণ গিরিপথ পাহারা দেন। তিনি পুরো রাত ঘোড়ার পিঠে থেকে দায়িত্ব পালন করেন এবং নামাজ ও প্রয়োজন ছাড়া দায়িত্বস্থল ত্যাগ করেননি।

পরদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে উদ্দেশ করে বলেন, “তুমি নিজের জন্য জান্নাত অবধারিত করে নিয়েছ।” (আবু দাউদ, হাদিস : ২৫০১)

এই সুসংবাদ তার নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া হয়েছিল।

সুসংবাদ যাদের জন্য

রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, “সুসংবাদ ওই বান্দার জন্য, যে আল্লাহর পথে সদা প্রস্তুত থাকে। তাকে পাহারায় নিয়োজিত করলে সে পাহারায় থাকে, আর পেছনে রাখলে পেছনেই থাকে।” (বুখারি : ২৮৮৭)

বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিক্ষা

বর্তমান সময়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনী, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, কোস্ট গার্ড এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যরা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের নিরাপত্তা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করছেন। আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নিয়তে তারা দায়িত্ব পালন করলে কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত এসব ফজিলতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আশা করতে পারেন।

ইসলামের দৃষ্টিতে সীমান্ত পাহারা ও জনপদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি মহান ইবাদত। এক দিনের প্রহরা দুনিয়ার সব সম্পদের চেয়েও মূল্যবান, আবার এক দিন-এক রাতের প্রহরা এক মাসের নফল ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ বলে বর্ণিত হয়েছে। এমনকি এর সওয়াব মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে।

যারা দেশ, সমাজ ও মানুষের নিরাপত্তার জন্য নিজের জীবন ঝুঁকির মধ্যে রেখে দায়িত্ব পালন করেন, ইসলাম তাদের বিশেষ সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী হিসেবে বিবেচনা করে। কারণ ইসলাম শুধু আনুষ্ঠানিক ইবাদতের শিক্ষা দেয় না; বরং মানুষের নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার জন্য নিবেদিত দায়িত্বপূর্ণ কাজকেও মহৎ আমল হিসেবে মূল্যায়ন করে।

আল্লাহ তাআলা দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের খেদমত কবুল করুন, তাদের হেফাজত করুন এবং দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমিন।

/এসএন