• ঢাকা
  • শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:১৯ এএম


ছোট্ট দ্বীপ, বড় ইতিহাস: কেপ ভার্দেতে যেভাবে বিকশিত হয়েছে ইসলাম

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৩০ জুন ২০২৬ ১০:২২ পিএম

আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে অবস্থিত ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বকাপ ফুটবলে চমক দেখিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। তবে ফুটবলের এই সাফল্যের আড়ালে দেশটিতে ইসলামের ধীরে ধীরে বিকাশের একটি নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসও রয়েছে।

সংখ্যায় অল্প হলেও কেপ ভার্দের মুসলিমরা বর্তমানে দেশটির অর্থনীতি, সামাজিক সম্প্রীতি এবং মানবিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। দীর্ঘ ঔপনিবেশিক দমন-পীড়নের ইতিহাস অতিক্রম করে তারা ধীরে ধীরে নিজেদের ধর্মীয় পরিচয়, প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক অবস্থান সুদৃঢ় করেছেন।

২০২১ সালের জাতীয় আদমশুমারি অনুযায়ী, কেপ ভার্দের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ মুসলিম। প্রায় পাঁচ লাখ জনসংখ্যার এই দেশে মুসলিমের সংখ্যা আনুমানিক পাঁচ হাজার। তাদের অধিকাংশই পশ্চিম আফ্রিকার সেনেগাল, গিনি-বিসাউ এবং মালি থেকে আসা অভিবাসী।

রাজধানী প্রাইয়া, বন্দরনগরী মিনদেলো এবং পর্যটননির্ভর সাল ও বোয়া ভিস্তা দ্বীপে মুসলিমদের বসবাস বেশি। সুন্নি মতাদর্শ অনুসরণকারী এসব মুসলিম মূলত খুচরা ব্যবসা, নির্মাণশিল্প, পর্যটনসেবা, পরিবহন ও হস্তশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তাদের অনেকেই পশ্চিম আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী সুফি ধারা—বিশেষ করে তিজানিয়া ও মুরিদ তরিকার সাংস্কৃতিক প্রভাব বহন করেন, যা তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনাচরণে প্রতিফলিত হয়।

কেপ ভার্দেতে ইসলামের ইতিহাস প্রায় সাড়ে পাঁচ শতাব্দী পুরোনো। ১৪৬২ সালে পর্তুগিজরা দ্বীপপুঞ্জে উপনিবেশ স্থাপন শুরু করলে এটি দ্রুত আটলান্টিক দাসবাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়। সে সময় সেনেগাম্বিয়া ও আপার গিনি অঞ্চল থেকে আগত মুসলিম ব্যবসায়ী ও ক্রীতদাসদের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো ইসলামের আগমন ঘটে।

ওলোফ, মানদিলকা ও ফুলানি জনগোষ্ঠীর বহু মুসলিম আখখেত ও গৃহস্থালি শ্রমে নিয়োজিত ছিলেন। ইতিহাসবিদদের মতে, তাদের অনেকের ইসলামি জ্ঞান ও ধর্মীয় শিক্ষার ভিত্তি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী।

তবে পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক শাসনামলে ক্যাথলিক ধর্মের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। অনেক মুসলিম ক্রীতদাসকে জোরপূর্বক খ্রিস্টধর্ম গ্রহণে বাধ্য করা হয়। কোরআন তেলাওয়াত ও প্রকাশ্যে ধর্মীয় আচার পালনের ওপরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ফলে দীর্ঘ ঔপনিবেশিক যুগে কোনো স্থায়ী ইসলামি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি।

তারপরও ইসলামের সব চিহ্ন মুছে যায়নি। স্থানীয় ক্রেওল ভাষা ও সংস্কৃতিতে ওলোফ ও মানদিলকা ভাষার কিছু শব্দ এবং পশ্চিম আফ্রিকান মুসলিম সংস্কৃতির নানা উপাদান আজও সেই ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে রয়েছে। বর্তমানে দাপ্তরিক ভাষা পর্তুগিজের পাশাপাশি অভিবাসী মুসলিমদের মধ্যে ফরাসি ও ওলোফ ভাষারও প্রচলন রয়েছে।

১৯৭৫ সালের ৫ জুলাই পর্তুগালের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর কেপ ভার্দের সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়। এর ফলে মুসলিমরা প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে ধর্মচর্চার সুযোগ পান।

১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে পর্যটনশিল্পের বিকাশ, বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধির ফলে মুসলিম অভিবাসীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৯৯০ সালে রাজধানী প্রাইয়ায় দেশের প্রথম সরকারি স্বীকৃত মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা মুসলিমদের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।

পরে ২০১৪ সালে অন্তত ৫০০ সদস্যবিশিষ্ট ধর্মীয় সংগঠনকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার আইন কার্যকর হলে মুসলিম সংগঠনগুলো আনুষ্ঠানিক আইনি মর্যাদা ও কর-সুবিধা লাভ করে। এর মাধ্যমে কেপ ভার্দের মুসলিম সমাজের সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়।

বর্তমানে সংখ্যায় সংখ্যালঘু হলেও কেপ ভার্দের মুসলিমরা দেশটির অর্থনীতি, সামাজিক সম্প্রীতি ও বহুসাংস্কৃতিক সমাজ গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা রেখে চলেছেন। বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের সাফল্যের পাশাপাশি দেশটির এই বহুত্ববাদী ধর্মীয় ইতিহাসও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আগ্রহের জন্ম দিচ্ছে।

/এএসএফ